লাইফস্টাইল

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিয়ে যত প্রশ্ন

রাজনীন ফারজানা

দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাসে গণটিকা কর্মসূচী শুরু হয়েছে। ২৭ জানুয়ারি ২৬ জনকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এ কর্মসূচীর উদ্বোধন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ করোনা মহামারি নির্মূলে গণটিকার উপর জোর দিয়েছেন। তবে বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু হলেও তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে রয়েছে নানা জিজ্ঞাসা। এমন কিছু জিজ্ঞাসার উত্তর জেনে নেওয়া যাক আজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিবিসি, ইয়েল মেডিসিন, রিয়েল সিম্পল ডট কম এবং ইউএস নিউজ অবলম্বনে প্রশ্ন ও উত্তরগুলো সাজানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্রহণ কতটা নিরাপদ?
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিনের ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ ড. ক্যাথলিন নুজিল বলেন, ‘ভ্যাকসিনগুলো অত্যন্ত উঁচু দরের। এগুলো শুধু কাজই করে না, খুব ভালোভাবেই কাজ করে। ভ্যাকসিন নিলে আপনি অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাবেন। ফলে আপনার জীবন বাঁচার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এই মহামারিতে মৃত্যুহার কমাতে তাই ভ্যাকসিনের বিকল্প নাই’। নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুত বাজারজাত হলেও এই ভ্যাকসিন যথেষ্ট নিরাপদ’।

ভ্যাকসিন নিলে কি কোন অ্যালার্জিক রিয়েকশন হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের ১৪ থেকে ২৩ ডিসেম্বর ফাইজারের প্রথম ডোজ দেওয়ার পর ২১ জন ব্যক্তির মারাত্মক ধরণের অ্যানাফিল্যাক্সিস দেখা দেয়। তবে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত সাপ্তাহিক মৃত্যুহারের প্রতিবেদনে ‘রেয়ার কেস’ হিসেবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় প্রায় ১৯ লাখ মানুষকে ফাইজারের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। সেক্ষেত্রে অ্যানাফিল্যাক্সিসে আক্রান্তের হার প্রতি ১০ লাখে ১১ জন।

বিজ্ঞাপন

তবে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) সূত্রে জানা যায়, আগে নেওয়া অন্যান্য রোগের ভ্যাকসিনেও ওইসব ব্যক্তির মারাত্মক অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। ভ্যাকসিন দেওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যেই এই প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং প্রত্যেকেই পরে সুস্থ হয়ে গেছেন।

আর চলতি বছরের জানুয়ারির ৫ তারিখ পর্যন্ত মোট ৫৩ লাখ আমেরিকান ফাইজার অথবা মডার্নার টিকা নিয়েছেন, যাদের মধ্যে মোট ২৯ জনের মারাত্মক ধরণের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাহলে প্রশ্ন উঠে, যাদের এর আগে কোনো ভ্যাকসিন নেওয়ার সময় অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, তারা কি ভ্যাকসিন নেবেন না? এর জবাবে, সিডিসির সাবেক বিশেষজ্ঞ ডা. টম কেনিয়ন জানান, তারাও ভ্যাকসিন নিতে পারবেন। তার মতে, অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে যাদের তারা অবশ্যই ভ্যাকসিন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা পাবেন এমন জায়গায় যেন ভ্যাকসিন নেন।

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিন নিলেও কি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে?
সিডিসির সাবেক পরিচালক ডা. ফ্রেইডেন বলেন, ‘ভ্যাকসিন নিলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ভয় নেই। এগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেন আমাদের শরীর কোভিড-১৯ ভাইরাস চিহ্নিত করতে ও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে’।

আমি ভ্যাকসিন পাবো কি-না কীভাবে জানবো?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিটি দেশেই আলাদা আলাদা নীতিমালা ঠিক করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও বয়স ও পেশাগত (সম্মুখসারির যোদ্ধা) গুরুত্ব বিবেচনায় বিভিন্ন ধাপে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তাই আপনি ভ্যাকসিন কখন আর কীভাবে নিতে পারবেন তা জানতে সরকারি ওয়েবসাইটে গেলেই তথ্য পাবেন।

বিজ্ঞাপন

শিশুরাও কি ভ্যাকসিন পাবে?
এখন পর্যন্ত শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়ার কোনো কার্যক্রম বাংলাদেশে নেওয়া হয়নি। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৬ থেকে ১৭ বছরের শিশুদের ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় আনা হচ্ছে।

ভ্যাকসিনের কয়টি ডোজ নিতে হবে?
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি ভ্যাকসিন কোভিশিল্ড প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এটি তিন মাসের ব্যবধানে দু’টি ডোজ নিতে হবে। ফাইজার এবং মডার্নার ভ্যাকসিনেরও কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দু’টি করে ডোজ নিতে হবে। ফাইজাররের ভ্যাকসিন তিন সপ্তাহের ব্যবধানে আর মডার্নার ভ্যাকসিন চার সপ্তাহের ব্যবধানে নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিনের সাধারণ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াগুলো কী?
হাতে কিছুটা ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার পর মারাত্মক ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও অল্পকিছু ব্যক্তির অবসাদ, শীত লাগা, মাথাব্যথা, জ্বর, পেশি ও অস্থি-সংযোগে ব্যথা হতে পারে। যাইহোক, যে কোন লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।

ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ সময়মতো না নিলে কী হতে পারে?
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বেই ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা তাড়াহুড়া তো আছেই। সেই সঙ্গে এরকম বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভ্যাকসিন প্রয়োগের আওতায় আনার অভিজ্ঞতাও বিশ্ববাসীর এর আগে হয়নি। তাই দ্বিতীয় ডোজ ভ্যাকসিন নিতে কিছুটা দেরি হতে পারে। তবে মার্কিন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে আতঙ্কের কিছু নেই, বরং দেরিতে হলেও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া উচিত। নতুন করে আবার ডোজ শুরুর প্রয়োজন নেই।

ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও কী করোনাভাইরাস ছড়ানোর কোনো আশঙ্কা আছে?
এটি এখনও নিশ্চিত নয়। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও কেউ করোনাভাইরাস ছড়াতে পারেন বলে আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

ভ্যাকসিন নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক ভ্রমণ কি শুরু করা যাবে?
খুব সম্ভবত ভ্যাকসিন ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে। অনেক দেশেই ভ্রমণের আগে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্রহণের প্রমাণ চাইতে পারে।

ভ্যাকসিন কতদিন নিরাপত্তা দেবে?
সবেমাত্র প্রয়োগ শুরু হওয়ায় এখনই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। ছয় মাস বা বছরখানেক গেলেই তবে তা বোঝা যাবে হয়তো। এ বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

ভ্যাকসিন নিলেও মাস্ক কেন পরতে হবে?
মাস্ক পরতেই হবে, কারণ কে ভ্যাকসিন নিয়েছে আর কে নেয়নি তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোনো ভ্যাকসিন যদি ৯৫ শতাংশও কার্যকরী হয়, বাকি ৫ শতাংশের মাধ্যমেও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি।

ডায়েবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, সিওপিডি, হৃদরোগ, কিডনি আক্রান্তরা কি এই ভ্যাকসিন নিতে পারবেন?
এমন রোগ যাদের আছে তারা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভ্যাকসিন নেবেন না।

গর্ভবতী নারী কি ভ্যাকসিন নেবেন?
গর্ভধারণ ও বুকের দুধ খাওয়ানো ভ্যাকসিন গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয় বলে জানিয়েছেন ডা. নুজেল। তবে এমন কেউ ভ্যাকসিন নেবেন কিনা তা নিজ নিজ চিকিৎসক দ্বারা নির্ধারণ করাই ভালো। বিশেষ করে, কারও অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এই ভ্যাকসিন নিলে কি নারীরা সন্তান ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবেন?
ডা. নুজেলের মতে, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিয়ে অসংখ্য গুজবের মতো নারীর সন্তান ধারণে অক্ষমতার কথাটিও একটি গুজব। এর কোনো ভিত্তি নেই বলে মনে করেন তিনি।

সারাবিশ্বের মানুষ কখন থেকে ভ্যাকসিনের সুফল ভোগ করতে শুরু করবে?
আসলে ভ্যাকসিন দেওয়ার উদ্দেশ্যই হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন। ইয়েল মেডিকেলের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৭৫ শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিন নিলে তবেই সেদেশে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হবে।

কেউ কি তার ইচ্ছামতো ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে পারবে?
বাংলাদেশ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতায়ও এখনই তা সম্ভব নয়। সরকার নির্ধারিত ব্যবস্থাতেই সবাইকে ভ্যাকসিন নিতে হবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এখন পর্যন্ত তেমন পদ্ধতিই অবলম্বন করা হচ্ছে।

এটি কি বাৎসরিক ভ্যাকসিন, নাকি জীবনে একবার নিলেই হবে, নাকি এক যুগে একবার?
বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে। তাই আপাতত নিশ্চিত কোনো জবাব কেউ দিতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান উদ্দেশ্য সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা। ছয় মাস বা এক বছর পর প্রথম পর্যায়ের ভ্যাকসিন গ্রহণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও কতদিন পর পর নিতে হবে তা বোঝা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

ভ্যাকসিন কি করোনাভাইরাসের নতুন নতুন ধরনের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে?
ইয়েল মেডিকেলের বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার নতুন নতুন ধরন এলেও মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে করোনাভাইরাসের জন্য বর্তমানে পাওয়া ভ্যাকসিনই দিতে হবে।

একবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন যারা তাদেরও কি ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে?
যারা একবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তাদেরও ভ্যাকসিন নিতে হবে। অন্তত ৩০ দিন আগে সংক্রমণের শিকার ব্যক্তিরাও এই টিকা নিতে পারবেন। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ভেতর থেকে রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা মজবুত করে। তাই সবাইকেই করোনা ভ্যাকসিন নিতে হবে।

সারাবাংলা/আরএফ/আইই


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button