ফিচার

রোকেয়ার চোখে পুরুষতন্ত্র এবং বর্তমান পুরুষতন্ত্র-পর্ব ২

আঞ্জুমান রোজী

রোকেয়ার সময়ে পুরুষতন্ত্রের স্বরূপ এবং বর্তমান সময়ে পুরুষতন্ত্রের স্বরূপের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। এখন থেকে একশত বছর আগের পুরুষতন্ত্রের ধারাবাহিকতাতেই এই সমাজ চলছে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে এবং পৃথিবী প্রগতির দিকে এগিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু মানসিকতা সেই অর্থে বদলায়নি। কারণ, আমরা বর্তমান সময়ে লক্ষ্য করি যে, রোকেয়ার উত্তরসূরী তসলিমা নাসরীন পুরুষতন্ত্র, পিতৃতন্ত্রের গায়ে কষাঘাত করেছিলেন বলে, তাকে দেশছাড়া হতে হয়েছে। অনেকটা রোকেয়ার মতো বর্জন করেন সমস্ত প্রথাগত ভূমিকাকে এবং মোল্লাতন্ত্রের ধর্মীয় গোড়ামীকে। তসলিমা নাসরিন আত্মরক্ষার জন্য কোনো সমোঝোতার মধ্যে যাননি এবং সতীসাধ্বী নারী হওয়ারও চেষ্টা করেননি। কিন্তু রোকেয়া সমাজের সঙ্গে সহনশীল ভূমিকা রেখে অর্থাৎ পুরুষতন্ত্রকে অনেকটা মেনে নিয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন। আমাদেরকে একটা বিষয় বিশেষভাবে ভাবতে হবে যে, মধ্যযুগের মতো অন্ধকার সময়ে রোকেয়ার ভূমিকা যদি সহনশীল না হতো তাহলে নারীমুক্তির সুদূরপ্রসারী এই আন্দোলন বেগবান হতো না; কতটা বিচক্ষণতার, বুদ্ধিমত্তার এবং আত্মপ্রত্যয়ের পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন যে, আজ একশত বছর পরেও আমরা তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি । তারপরও দু’জনের উদ্দেশ্য একই ছিল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এমনই নির্মম যে, বাংলাদেশের পিতৃতন্ত্র, পুরুষতন্ত্র তসলিমা নাসরিনের উপর আক্রমণ চালায় এবং পরিশেষে তাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করে। কিন্তু তসলিমা লড়াইয়ে অস্ত্ররূপে নিয়েছিলেন প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসকে। সময়ের ধারাবাহিকতায় পুরুষতন্ত্র বুঝতে হলে রোকেয়াকে যেভাবে পড়তে হবে ঠিক সেভাবে তসলিমা নাসরিনকেও পড়তে হবে। যদিও বাহ্যত পুরুষতন্ত্রের একাল সেকাল সবই কিন্তু এককাল।

বিজ্ঞাপন

রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কারণে বাঙালি হিন্দু নারীর জীবন ও প্রাণ দুইই যখন রক্ষা পেল, তখন প্রয়োজন পড়লো নারীর মানসিক মুক্তির। আর কতকাল অন্যের দয়ায় নারীর জীবন চলবে! তাদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং নিজের আলোয় পৃথিবীটা দেখা প্রয়োজন। নারীরও যে একটা স্বতন্ত্র স্বর আছে তা জাগানো দরকার। এ জন্য এগিয়ে এলেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০—৯ ডিসেম্বর ১৯৩২)। তিনি প্রয়োজন অনুভব করলেন নারী শিক্ষার। গুরুত্ব দিলেন নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির ওপর। এ যেন ইতিহাসের দারুণ এক পরম্পরা। একেই বুঝি বলে ইতিহাসের মশাল দৌড়। রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের হাত ঘুরে নারীকল্যাণের মশালটি বহনের দায়িত্ব এসে পড়লো রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মতো বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী এক শক্ত হাতের মানুষের কাছে। রোকেয়া হলেন বঙ্গ সমাজের প্রথম নারীবাদী। কিন্তু তিনি নারীবাদী বিষয়টা বুঝতেন না। নিজস্ব বিবেকবুদ্ধি এবং স্বশিক্ষা দ্বারা বুঝতে পারলেন যে, সমাজে নারীর কোনো অবস্থান নেই অর্থাৎ তাকে মানুষই মনে করা হয়৷ না। তখন নারীমুক্তির কাজ করতে গিয়ে রোকেয়া কঠিনভাবে আক্রমণ করেছেন পুরুষতন্ত্রকে। কিন্তু বর্তমান পুরুষতন্ত্র তাঁকে পুণ্যবান মহীয়সী নারী হিসেবে ভক্তি শ্রদ্ধা করেন; যা কোনো প্রথাগত নারীর জন্যে এক পরম প্রাপ্তি। যদিও রোকেয়ার জন্যে এটা খুবই শোচনীয় স্বীকৃতি। ভারতীয় ভূভাগের এক বড়ো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে বিদ্রোহীদের মূলেই উপড়ে ফেলা হয় বা চেষ্টা করা হয় উপড়ে ফেলার, তবে তা সম্ভব না হলে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয় প্রথার ভেতর বিন্যস্ত করে। বিদ্রোহীরা হয়ে ওঠেন প্রথাগত। রোকেয়াকেও তাই করা হয়েছে; রোকেয়া হয়ে উঠেছেন এক মহীয়সী পুণ্যময়ী সতী নারী বা একজন মুসলমান ভদ্রমহিলা। এভাবে চূড়ান্তরূপে বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে রোকেয়াকে। যার কারণে বর্তমানে অনেক নারীবাদীর কাছে রোকেয়া হয়ে উঠেছেন অস্পৃশ্য এবং বিসদৃশ। রোকেয়ার নামের বিষয়েও অবাক লাগে। তিনি নিজে কখনো ‘বেগম’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। অথচ পুরুষেরা ও তাঁর ভক্ত প্রথাগ্রস্ত নারীরা তাঁকে বিখ্যাত ক’রে তুলেছেন ‘বেগম রোকেয়া’ নামে। তাঁর নাম ছিলো রোকেয়া বা রুকাইয়া খাতুন।

হুমায়ুন আজাদের একটা উদ্ধৃতি তুলে ধরলে বিষয়টা আরো পরিস্কার হবে। “রোকেয়াকে উপমহাদেশের পুরুষতন্ত্র, মহীয়সী পুন্যময়ী সতী নারী বা একজন মুছলমান ভদ্রমহিলা ভাবতে সুখ ও স্বস্তিবোধ করে। কিন্ত্ত আমরা দেখতে পাই, রোকেয়ার সমগ্র রচনাবলী ভরে আছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তীব্র ঘূণা দিয়ে। ‘পুরুষ’ ধারণাটিই ছিলো তার কাছে আপত্তিকর। পুরুষতন্ত্রকে যেটুকু সামান্য করুণা করেছিলেন তা সম্ভবত তাঁর ভাই ও স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে। বোধকরি পশ্চিমে প্রথম নারীবাদী মেরি ওলষ্টোনক্রাফটের মধ্যে এতো বেশি পুরুষবিদ্ধেষ ও দ্রোহিতা দেখা যায় না। তবুও রোকেয়াকে রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ, পুরুষতন্ত্র পূজা করে। কারণ রোকেয়াও এক সময়তে গিয়ে ধর্মের সাথে কিছুটা সন্ধি করেছেন আত্মরক্ষার জন্যে। নইলে তাঁকে ও তাঁর আর্দশকে অতন্ত্য বিপন্ন করে তুলতো মুছলমান পিতৃতন্ত্র।” (পুরুষতন্ত্র ও রোকেয়ার নারীবাদ: হুমায়ূন আজাদ)

বিজ্ঞাপন

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপট স্পষ্ট দেখতে পাই। যেখানে সময়ের খুব একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়না। সেই শত শত বছর আগের পুরুষ বান্ধব সমাজই এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আছে। এই পুরুষতন্ত্রকে ভাংতে চেয়েছিলেন রোকেয়া। বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশই জানে না, রোকেয়ার রচনাবলি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক মহাযুদ্ধ। এমন কি এই অঞ্চলে প্রথাগত পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়েও তিনি চিন্তা -চেতনায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। যদিও পুরুষতন্ত্রের বিচারে এবং রোকেয়ার মর্ষকামীতা ও ব্রহ্মচর্যতার কারণে তিনি আমাদের কাছে পাঠ্য ও পূজনীয় হয়ে উঠেছেন। যদিও তিনি লেখনীর মাধ্যমে রক্তাক্ত করে দিয়েছেন পুরুষতন্ত্রকে। তিনি বলেছেন, “আশরাফগণ সপ্তম বর্ষীয়া বিধবা কন্যাকে চির বিধবা রাখিয়া গৌরব বোধ করেন। আমি যে ২২ বত্সর যাবত বৈধব্যের আগুণে পুড়েছি।” এমন বক্তব্যে তাঁর তীব্র ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটে।

রোকেয়া জানতেন, তিনি পৃথিবীর এক বর্বর পিতৃতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। তাঁকে বিদ্রোহ করতে হবে ঐ বর্বরতাকে স্বীকার করেই। ওলস্টোক্র্যাফটের জীবন এ-সমাজে অকল্পনীয়। রোকেয়া নিজের মধ্যে সংহত করেছিলেন প্রবল দ্রোহিতা ও মর্ষকামিতাকে। পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ ও পরাভূত করার জন্যে তাকে সহ্য করতে হয়েছে পুরুষতন্ত্রের পীড়ন। কিন্তু তিনি পুরুষতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্যে নিরন্তর লড়াই ক’রে গেছেন। তুলনাহীনভাবে আক্রমণ করেছেন পুরুষতন্ত্রের ধর্মকে। রোকেয়া পরে ধর্মের সাথে কিছুটা সন্ধি করেছেন আত্মরক্ষার জন্যে। তিনি এমন এক পিতৃতন্ত্রের সদস্য ছিলেন, যেখানে পুত্র মাকে শেখায় সতীত্ব। তাঁর ভাগনে আবদুল করিম গজনভি, বাল্যকালেই বিলেতে গিয়েছিলেন, মন্ত্রী আর স্যার হয়েছিলেন, কিন্তু মধ্যযুগ থেকে বেরোতে পারেন নি; তিনি খালা রোকেয়াকে পর্দা শেখাতে দ্বিধা করেন নি। খালাকে শর্ত দিয়েছিলেন যদি খালা পর্দা মানেন (এর অর্থ রোকেয়ার আচরণ পর্দাসম্মত ছিলো না বিলোত ফেরত স্যার-ভাগনের মতে), তবে তিনি রোকেয়ার স্কুলটি সরকারি করে দেবেন। পরবর্তীতে অবশ্য সেই ভাগনে স্কুলটি সরকারি করণে সহায়তা করেন (১৯০৪-এ বেরোয রোকেয়ার প্ৰবন্ধ ‘আমাদের অবনতি’ (নবনূর : ১৩১১, ভাদ্র), পরে মতিচুর-এ (প্রথম খণ্ড : ১৯০৫) মুদ্রিত হয় এর খণ্ডিত, মুসলমান পিতৃতন্ত্রের অনুমোদিত রূপ; স্ত্রীজাতির অবনতি’)।

বিজ্ঞাপন

রোকেয়া বিশ্বাস করেন যখন সমাজবন্ধন ছিলো না, তখন মুক্ত স্বায়ত্তশাসিত ছিলো নারী। সমাজবন্ধনের মূলেই রয়েছে পরিবার, তাই পরিবারই যে নারীর দাসীত্বের মূল কারণ, তা অস্পষ্ট থাকেনি তাঁর কাছে। পরিবারে পুরুষ হয়েছে প্ৰভু, নারী হয়েছে দাসী। তিনি অবশ্য প্রশ্ন করেছেন, ‘আমাদের এ বিশ্বব্যাপী অধঃপতনের কারণ কেহ বলিতে পারেন কি? সম্ভবত সুযোগের অভাব ইহার প্রধান কারণ। স্ত্রীজাতি সুবিধা না পইয়া সংসারের সকল প্রকার কার্য হইতে অবসর লইয়াছে।’ সুযোগটা যে নারীকে দেয়নি পুরুষ, তাও তিনি জানিয়েছেন। যুগ যুগ ধরে দাসত্বের কুপ্রভাব পড়ে দাসদের স্বভাবের ওপর, নারীর ওপরেও পড়েছে; রোকেয়া তাও দেখিয়েছেন চমৎকার ও বিস্তৃতভাবে। তিনি আরো বলেছেন: ‘আমাদের মন পর্যন্ত দাস (enslaved) হইয়া গিয়াছে।’ রোকেয়া প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা শারীরিক বল, মানসিক সাহস, সব কাহার চরণে উৎসর্গ করিয়াছি?’ ওলস্টোনক্র্যাফটের মতোই বলেছেন, ‘শরীর যেমন জড়পিণ্ড, মন ততোধিক জড়।’ আরো বলেছেন, ‘আমাদের শয়ন-কক্ষে যেমন সূর্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রুপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পারে না। বহুকাল হইতে নারী-হৃদয়ের উচ্চ বৃত্তিগুলো অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায়, নারীর অন্তর, বাহির, মস্তিষ্ক, হৃদয় সবই “দাসী” হইয়া পড়িয়াছে।’

নারী শুধু দাসীই নয়, তারও নিম্নস্তরের। তিনি বলেছেন, ‘আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি।’ তিনি দেখিয়েছেন নারী আসলে নিরাশ্রয়, কেননা তার নিজের বলে কিছু নেই; এমনকি নিজের ওপরও নেই নারীর নিজের অধিকার। নারীর সবখানেই থাকে পরাশ্ৰিত; যখন আমরা রাজকন্যা, রাজবধুরূপে প্রাসাদে থাকি, তখনও প্রভু-গৃহে থাকি। যখন… গোশালায় গিয়া আশ্রয় লই,-তখনও অভিভাবকের বাটিতে থাকি।.গৃহ বলিতে আমাদের একটিও পর্ণকুটীর নাই। প্ৰাণী-জগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয় নহে। সকলেরই গৃহ আছে- নাই কেবল আমাদের’ (‘গৃহ’ প্রবন্ধ)। ‘পদ্মরাগে’ নায়িকা সিদ্দিকার উক্তি আসলে রোকেয়ার নিজেরই সুচিন্তিত বক্তব্য, “আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারীজন্মের চরম লক্ষ্য নহে, সংসারধর্ম জীবনের সারধর্ম নহে।” রোকেয়ার মতে, মনুষ্যজীবনের সারধর্মই হলো সৃজনপ্রয়াস। এই চিন্তাটা প্রতিষ্ঠা করতে তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

পুরুষ’ ধারণাটি রোকেয়ার ধারাবাহিক আক্রমণস্থল। তিনি উপহাস করেছেন পুরুষকে, তাকে গণ্য করেছেন পশুর থেকেও নিকৃষ্ট, আদমেব কাল থেকেই পুরুষকে দেখিয়েছেন নির্বোধরূপে। পুরুষ তার চোখে প্ৰতারক আর পীড়নকারী। প্রাচীন কাল থেকে বিশ্বজুড়ে চলে এসেছে নারীর প্রতি যে-ধারাটি, রোকেয়া একা যেনো তাকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন প্রচণ্ড পুরুষবিদ্বেষের সাহায্যে। পুরুষ তাঁর নিরন্তর আক্রমণলক্ষ্য, কেননা পুরুষ নারীকে পরিণত করেছে দাসীতে, পুরুষ কেড়ে নিয়েছে নারীর স্বাধিকার ও স্বাধীনতা। তিনি পুরুষকে বলেছেন, ‘নিরাকারে পিশাচ’ (‘গৃহ’)। আরো বলেছেন, ‘ডাকাতী, জুয়াচুরি, পরস্বাপহরণ, পঞ্চ ‘মকার’ আদি কোন পাপের লাইসেন্স তাঁহাদের নাই?’(পদ্মরাগ) বাঙালি পুরুষকে পরিহাস ক’রে বলেছেন, ‘ভারতের পুরুষসমাজে বাঙ্গালী পুরুষিকা'(‘নিরীহ বাঙ্গালী’)! পদ্মরাগ-এর সকিনা লতিফকে বিদ্রুপ করে বলেছে, ‘খোদাতালার সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব পুরুষ হইয়াছেন, ইহা অপেক্ষা আর কি বাঞ্ছনীয়?’ এক বাক্যে তিনি কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরুষ ও তার স্রষ্টাকে। পুরুষকে বলেছেন প্রতারক : বহুকাল হইতে পুরুষ নারীকে প্রতারণা করিয়া আসিতেছে, আর নারী কেবল নীরবে সহ্য করিয়া আসিতেছে।’ আরো বলেছেন, ‘কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য। (‘ডেলিশিয়া হত্যা’); যদি স্বার্থপরতা, ধূৰ্ততা ও কপটাচারকে সদগুণ বলা যায়, তবে অবশ্য পুরুষজাতি কুকুরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ!’ পুরুষ তাঁর চোখে অলস। বলেছেন: ‘অলসেরা অতিশয় বাকপটু হয়’ (‘সুলতানার স্বপ্ন’)।

পুরুষতন্ত্রের তৈরি এক ঐশী ভাবাদর্শ স্বামী, যা পুরুষকে উত্তীর্ণ করেছে নারীর বিধাতার স্তরে। হিন্দু নারীরা স্বামীকে পুজো করে, হিন্দু নারীর জন্যে স্বামী ছাড়া আর কোনো প্ৰভু নেই; মুসলমান নারীর বেহেস্তও স্বামীর পদতলে, এবং হাদিসে আছে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সেজদা করার বিধান যদি থাকতো, তাহলে নারীকে নির্দেশ দেযা হতো স্বামীকে সেজদা করার। বাঙলায় ‘স্বামী’ শব্দ ও ধারণাটি এখন অশ্লীল হয়ে উঠেছে, এটা এখন পরিহার্য শব্দগুলোর একটি। রোকেয়া অনেক আগেই বাতিল করেছিলেন ‘স্বামী’ ধারণাটি। এটিকে বাতিল করার অর্থ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের একটি বড়ো মন্দির ধ্বংস করা। রোকেয়া বলেছেন, ‘তাহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্ৰমে আমাদের স্বামী হইয়া উঠিলেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশুপক্ষীর অন্তর্গত অথবা মূল্যবান সম্পত্তি বিশেষ হইয়া পড়িয়াছি!’ তিনি দাবি করেছেন নারী দাসীত্ব করে, তবে পুরুষও প্রেমবশত একধরনের দাসত্ব করে, কিন্তু পুরুষকে ‘দাস’ বলা হয় না।’ তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘সমাজ তবু বিবাহিত পুরুষকে ‘প্রেম-দাস’ না বলিয়া স্বামী বলে কেন?’ ‘স্বামী’ তাঁর কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দ। তিনি এ-শব্দটি বাতিল করে প্রস্তাব করেছেন একটি নতুন শব্দ। ‘আশা করি এখন থেকে ‘স্বামী’ স্থলে ‘অর্ধাঙ্গ’ শব্দ প্রচলিত হইবে।’

বিজ্ঞাপন

রোকেয়া প্রথাগত ছকবাধা নারীভাবমূর্তি বা ‘স্টেরিঅটাইপ স্বীকার করেন নি; তিনি ওই ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে তা বর্জন করেছেন। নারী হবে সীতা বা রহিমা, হবে মর্ষকামিতার উদাহরণ, পুরুষতন্ত্র তৈরি করেছে এমন ধারণা; তিনি তা বাতিল করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, ‘এ দেশের গ্রন্থকারেরা নারী চরিত্রকে নানা গুণ ভূষায় সজ্জিত করেন বটে; বেশীর ভাগে অবলা হৃদয়ের সহিষ্ণুতা বর্ণনা করা হয় (কারণ রমণী সহিষ্ণু না হইলে তাহার প্রতি অত্যাচারের সুবিধা হইত না যে!’ (‘ডেলিশিয়া-হত্যা’)। পুরুষতন্ত্র নারীকে করে তুলেছে মর্ষকামিতার উদাহরণ। কিন্তু রোকেয়া তা মানেন নি। পুরুষতন্ত্রকে বহুমুখি আক্রমণে বিপর্যস্ত করে রোকেয়া প্ৰতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর নারীতন্ত্র। নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন নারীস্থান, এবং পুরুষকে অবরুদ্ধ করেছেন গৃহের ভেতরে বদলে দিয়েছেন পুংলিঙ্গবাদী ভাষার স্বভাব, বার বার লিখেছেন ইউটোপিয়া ও অ্যান্টি-ইউটোপিয়া (বা ডিস্টোপিয়া)। নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সার্বিক উদ্যোগ নিয়েছেন রোকেয়া Sultana’s Dream (১৯০৫) বা সুলতানার স্বপ্ন’-এ। ইউটোপীয় ভাবনাকল্পনার মূলে থাকে বিশেষ ধরনের সমাজ, ঐ বিকৃত সমাজের চরম সংশোধন সম্পন্ন করা হয় ইউটোপিয়ায়।

রোকেয়া পুরুষতন্ত্র, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে যত লিখেছেন, প্রতিবাদ করেছেন এবং রুখে দাঁড়িয়েছেন ঠিক ততই এর পাশাপাশি তিনি নারীপুরুষ সম্মিলিত চলার এবং সমতার জীবনযাপনের কথা বলেছেন জোর দিয়ে৷ নারীপুরুষ উভয় উভয়ের পরিপূরক, এই বিষয়টা গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। রোকেয়ার চোখে নারীপুরুষ সমান ছিল বলে পুরুষের মন ও চোখ থেকে নারী নিয়ে নেতিবাচক ভাবনার টাবু ভাংতে চেয়েছেন। তিনি পুরুষতন্ত্রের একটি কাঠামোকেও বাদ দেননি আক্রমণ করে ধ্বস নামাতে। সেই সময়ের পুরুষতন্ত্র যেমন রোকেয়াকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করেছিল; আজ তসলিমাকেও তেমনি নিষ্ক্রিয় করে দিতে বদ্ধপরিকর । এর প্রমাণ প্রতি পদে পদে পাচ্ছি। উদ্ধত মোল্লাতন্ত্র রোকেয়া এবং তসলিমার উত্তরাধিকার নারীদের উপর অকথ্য ভাষার বিষবাষ্প ছড়ায় যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না । তবে পুরুষতন্ত্র মেনে চলা কথিত ভদ্রমহিলা, স্বামীর শিক্ষিত দাসী ও প্রমোদসঙ্গিনী, সামাজিক সুবিধাভোগী নারীরা তখনো রোকেয়াকে ব্যর্থ করতে চেষ্টা করেছিল এবং এখনো করতে চাচ্ছে তসলিমা ও বর্তমান প্রগতিবাদী নারী প্রজন্মকে। রোকেয়ার চোখে যেই পুরুষতন্ত্র ছিল এখনো প্রায় একই পুরুষতন্ত্র আমরা দেখতে পাই। সময়ে কি আজও কিছু বদলেছে?

সারাবাংলা/আরএফ


Source link

আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button