বিনোদন

উড়তে উড়তে কোটির ঘরে সোমেশ্বর-লুৎফরের ‘ঘুড়ি’

আহমেদ জামান শিমুল

সুরের আলাদা একটা ভাষা রয়েছে। যে ভাষা আপনাকে কাঁদাবে, হাসাবে, করবে বিষণ্ণ। এরকম বিষণ্ণ করা গান ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’। যে গান এ দেশের হাজারো তরুণের না পাওয়ার কষ্টের কথা বলে। যার সুর হৃদয়ে তৈরি করে হাহাকার। কেমন যেন এক মায়াময় ভুবনে নিয়ে যায়। সে মায়াময় গানটি এ ভিউবাজির যুগে সম্প্রতি ইউটিউবে অতিক্রম করেছে এক কোটি ভিউয়ের মাইলফলক। যদিও গানটি দেশের প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমীর শোনা। সে হিসেবে এখন পর্যন্ত অগণিত বার শোনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা শহরে প্রতিদিনই হাজারো তরুণ আসে জীবন গড়ার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে। কারো স্বপ্ন থাকে পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরির। কেউবা হতে চায় শিল্পী। কিন্তু ইট কাঠের এ শহরে এসে তাদের স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়। সামনে এসে দাঁড়ায় অভাব। দিনের পর পর দিন ময়লা টি-শার্ট গায়ে পরে ঘুরতে হয়। এরপরও সে স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্ন হচ্ছে সুখের।

এমনই এক সুখের খোঁজে সোমেশ্বর অলি লিখেছিলেন, ‘ময়লা টি-শার্ট/ ছেঁড়া জুতো/ কদিন আগেই ছিল মনেরই মতো/ দিন বদলের/ টানা-পোঁড়েনে/ শখের ঘুড়ি নাটাই সুঁতো/ ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো/ তার আকাশ কি আমার চেয়ে বড়?’

বিজ্ঞাপন

২০০৪ এ সদ্য ঢাকায় এসেছিলেন তরুণ সোমেশ্বর অলি। স্বপ্ন ছিল ‘ঢাকায় এসে বড় কবি হবেন’। টুকটাক কবিতা লিখতেন। ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ তেমন একটি কবিতা ছিল প্রথমে। চাল চুলোহীন বেকার জীবনের হাহাকার থেকে লিখেছেন গানটি। যদিও অধিকাংশ শ্রোতা এর সঙ্গে নিজের হারানো প্রেমকে খুঁজে বেড়ান।

‘এটা প্রেম সংক্রান্ত কোনো ব্যাপার থেকে লেখা না। এখানে ঘুড়িটা এখানে একটা সুখ অর্থে ছিল। একটা বেকার ছেলে যে কি না মাথা গোঁজার ঠায় খুঁজতেছে ঢাকায়। যে কি না বড় কবি হবে বলে ঢাকায় আসছে। কিন্তু তার কোন আয় নেই, চাকরি নেই। ওই হাহাকারের জায়গা থেকে লেখা ছিল গানটি’— স্মতিচারণ করতে গিয়ে বলেন অলি।

বিজ্ঞাপন

গানটিতে কণ্ঠ ও সুর লুৎফর হাসানের। তিনি তখন ঢাকায় ‘ছোট একটা চাকরি’ করতেন। আরেকজনের মাধ্যমে তার সঙ্গে অলির পরিচয়। অলি বলেন, “আমার গীতিকার হবার কোন বাসনা ছিল না। লুৎফর ভাই আমার সব লেখাই পড়তো। ‘ঘুড়ি’ও তার হাতে যায়। ওই সময়ে আমার লিরিক্স টুকটাক অন্যদের কাছে গেলেও ‘ঘুড়ি’ তিনি অন্যদের কাছে দেন নাই। প্রথমে নিজে নিজে একটা সুর করেছিলাম আমি। কিন্তু তিনি নতুন করে সুর করেছিলেন।”

উড়তে উড়তে কোটির ঘরে সোমেশ্বর-লুৎফরের ‘ঘুড়ি’

বিজ্ঞাপন

২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত এটা আড্ডার গান ছিল। তখন শাহবাগ, বেইলি রোড এসব জায়গায় আড্ডা  দিত একদল তরুণ সাংবাদিক। যারা সব জায়গায় এক সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো। তাদের কেউ হয়তো পত্রিকায় চাকরি করছে, কেউ বা ঢুকতে চাইছে। ওই সময়ে আড্ডায় সবাই গলা ছেড়ে গানটি গাইতেন। অলির ভাষায়, ‘গানটি আমাদের প্রাণের গান হয়ে গেল। তখন সবার কথায় গানটি রেকর্ডিং করলাম আমরা।’

২০০৯ সালে লুৎফর হাসান প্রথমে গানটি একটি মিক্সড অ্যালবামের জন্য রেকর্ড করেন। কিন্তু ২০১১ সালে গানটি ডেডলাইন মিউজিক থেকে গানটির নামেই অ্যালবাম বের হয়।

বিজ্ঞাপন

‘গানটা রেকর্ড হওয়ার পরে লুৎফর ভাইকে কেন্দ্র করে একটা দুর্ঘটনা ঘটে তার সার্কেলের মধ্যে। তখন ব্লুটুথের যুগ ছিল। ব্লুটুথ দিয়ে তার মোবাইল থেকে কে যেন নিয়ে যায়। একটা আড্ডায় ঘটনাটা ঘটে, যার কারণে মিক্সড অ্যালবাম আটকে যায়। তখন আমরা বুদ্ধি করে রেডিও আমারের আরজে রাজুর কাছে গেলাম’—বলেন অলি।

আরজে রাজুর কাছে গিয়েছিলেন লুৎফর হাসানসহ। তারা রাজুকে ঘটনা খুলে বললেন। উনি গানটা শুনে লুৎফরকে বলেন, ‘এ গান হিট করবে। দেন বাজাই। কেন এটা মিক্সড অ্যালবাম করবেন, এটা তো সলো অ্যালবামের গান। এটাকে শিরোনাম গান করে অ্যালবাম করেন।’

গানটা মানুষ এতটা ভালোবাসবে তা কি টের পেয়েছিলেন লুৎফর হাসান ও সোমেশ্বর অলি?

গানটি অফিসিয়ালি প্রকাশিত হওয়ার আগেই পাইরেসি হলো তখন বন্ধু মহল থেকে ফিডব্যাক পেয়েছিলেন অলি ও লুৎফর। অলি বলেন, আমার এক বন্ধু ঢাকা থেকে রাজশাহী যাচ্ছিল। সে হয়তো মেসেজে পাঠাচ্ছে, ‘বন্ধু কী লিখছিস? চোখ ভিজে যায়। এ ধরনের রিঅ্যাকশন আমরা নিজেরা নিজেরা পেতাম। তারপর যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে গানটা ব্লুটুথ থেকে পাইরেসি হয়ে গেল, তখন বোঝা যাচ্ছিল গানটা একটা ভালো জায়গায় যেতে পারে। রেডিওতে যখন গেল, তখন শ্রোতাদের মেসেজ পড়ে শুনাতো, একটা শোতে দুইবার করে বাজাতো। শুনতাম অনেকে গানটা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। আরজে রাজুর সঙ্গে আমরা যখন সরাসরি আড্ডা দিতাম, তখন ওই রিঅ্যাকশনগুলো জানতাম।’

লুৎফর হাসান বললেন, তারা এখন আর গানটিকে নিজেদের গান মনে করেন না। তার ভাষায় ‘এটি বিরহ কাতর তরুণদের গান হয়ে গেছে। আমরা খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম গানটি মানুষ শুনবে।’

গানটি ছিল ইউটিউবের আগের যুগের। প্রথমে মারজুক রাসেলকে মডেল করে গানটির একটি ভিডিও তৈরি হয়েছিল। যেটি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার হতো। এরপর ২০১৭ সালে ইউটিউবের জন্য বর্তমান ভিডিওটি তৈরি হয়।

লুৎফর বলেন, একটা গান ভাল-মন্দ বিচারের জন্য এর ভিউ অনেকেই বেশ বড় করে দেখেন। অথচ অনেক ভালো গানের ভিউ ইউটিউবে মাত্র ২ হাজার, এমনও আছে। তাই ভিউ কখনই গানের মানদণ্ড হতে পারে না। কোনপ্রকার বুস্টিং ছাড়া ‘ঘুড়ি’ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়ে তাই প্রমাণ করেছে।

সারাবাংলা/এজেডএস


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button