জাতীয়

বাংলাকে জীবিকার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে

আহমদ রফিক। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। তিনি একাধারে ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক, কবি ও কথাশিল্পী। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ছাত্রজীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন সাহিত্য চর্চার সঙ্গে। এছাড়াও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ছিল তার নিবিড় সংশ্লিষ্টতা। বিভিন্ন প্রগতিবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনে। আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন একজন লড়াকু সৈনিকের ভূমিকায়। পরে তার লেখালেখি বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে যোগ করেছে অসংখ্য অনবদ্য গ্রন্থ। জাতীয় ও সাহিত্য জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি অর্জন করেছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। ‘পূর্ণতার শুদ্ধ লক্ষ্যে’ এগিয়ে চলা ৯২ বছর বয়সী এই প্রাজ্ঞজনের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন সারাবাংলার জয়েন্ট নিউজ এডিটর প্রতীক মাহমুদ। সেই কথপোকথনের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে তুলে ধরা হলো

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: ভাষা আন্দোলনে রাজনৈতিক চেতনা কীভাবে কাজ করেছিল?

আহমদ রফিক: ভাষা আন্দোলনের প্রথমদিকে রাজনৈতিক আদর্শবাদের প্রভাব এককভাবে ছিল না। সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তান ও কেন্দ্রীয় সরকার জোর করে আমাদের ওপর উর্দূ চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে; আমরা এটাকে প্রতিহত করব। আমরা যুক্তিসংগতভাবে বলব যে, আমাদের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। অর্থাৎ উর্দূর পাশাপাশি আমরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ এটা ৪৮’র স্লোগানেও ছিল। আর ৫২-তে এসে এর সঙ্গে যুক্ত হলো রাজনৈতিক স্লোগানগুলো; ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা হলো- জাতি চেতনাকে সঙ্গে করে নিয়ে ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান। অথচ এটাকেই গুরুত্বহীন করে দেওয়া হলো স্বাধীন বাংলাদেশে পৌঁছে গিয়ে। ফলে ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজি উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষা, উচ্চ আদালত সর্বত্র চালু থাকল। এবং এটা নিয়ে শাসক সম্প্রদায়ের কোনো মাথাব্যাথা থাকল না।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: ভাষা আন্দোলনের মূল বিষয়টিকে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে আর প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

আহমদ রফিক: ভাষা আন্দোলনে পরে যেটা প্রধান্য পেল সেটাকে রাজনৈতিকভাবে আর প্রধান করে তোলা হয়নি। অর্থাৎ এটাকে যদি ব্যাখা করতে চাই, যারা এই আন্দোলন পরিচালনা করেছেন তাদের মধ্যে শ্রেণিগত চিন্তাটা যেমন ছিল না, তেমনি আলাদা আলাদা আদর্শগত চিন্তাও ছিল না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’- এই মূল বিষয়টিকেই তারা প্রধান করে তুলেছিলেন। সঙ্গে ছিল আনুষাঙ্গিক ওই স্লোগানগুলো। পরে এগুলো থেকে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটল। মানে যুক্তফ্রন্ট, ২১ দফা, ৬০ দশকের ৬দফা, ছাত্রদের ১১ দফা, মাওলানা ভাসানীর ১৪ দফা- পরে এইসব রাজনৈতিক কারণগুলো মিলে ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১’র চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী শ্রেণির স্বার্থ পূরণ হয়ে গেল। এদের স্বার্থ পূরণ হয়ে যাওয়ার কারণে এরা আর আগের আন্দোলনের চেতনাতে ফিরে গেল না। এমনকি ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধও করল না। ফলে ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজি যেভাবে প্রচলিত ছিল সেই ব্যবস্থাটাকেই তারা ধরে রাখল।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: রাজনৈতিক ইস্যু বা হাতিয়ার হিসেবে রবীন্দ্র ও নজরুলের সাহিত্য ভাষা আন্দোলনে কি প্রাধান্য পেয়েছিল?

আহমদ রফিক: ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে ৪৮’-এ রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে সংযুক্ত করা হয়নি। আর ৫২’তে তো আমি নিজেই সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলাম। ৫২’-এর কোনো বক্তৃতায় বা কাজে সরাসরি তাদের আনা হয়নি। কিন্তু স্লোগানে, পোস্টারে বা দেয়াললিপিতে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-আব্দুল হাকিমের কবিতা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে সরাসরি তাদের ব্যবহার করা হয়নি। বাঙালির সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনায় তাদের লেখাগুলো স্লোগানে-পোস্টারে-দেয়াললিপিতে এসেছে। আর এই ধারা ৬০-দশকে ব্যাপকভাবে চালু হয়। ভাষা আন্দোলনে আদর্শিকভাবে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছিল না। ভাষা আন্দোলন থেকে মূলত জাতি চেতনা বেরিয়ে এলো। আবার জাতি চেতনা যখন জাতীয়তাবাদ চেতনায় রূপান্তরিত হচ্ছিল তখন কিন্তু রবীন্দ্র-নজরুল ব্যাপকভাবে এসেছে। এদের সঙ্গে অবশ্য জীবনানন্দ দাশের কবিতাও প্রাধান্য পেয়েছিল। তাদের সাহিত্যের দেশ, মাতৃভূমি ও ভূ-খণ্ডের চেতনাই মূলত স্লোগান-পোস্টার-দেয়ালে প্রভাব ফেলে। মূলত ভাষা আন্দোলনের পর একুশ নিয়ে কবিতা ও সংগীত লেখা হলো। বলতে গেল একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে লেখা গান-কবিতা আন্দোলনের ফসল।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: ভাষা আন্দোলনে কি গণসংগীতও কোনো ভূমিকা রাখেনি?

আহমদ রফিক: গণসংগীতও ভাষা আন্দোলনের হাতিয়ার ছিল না। তবে ৬০’র দশকের আন্দোলনগুলোতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তখন বেশকয়েকটি সংগঠন থাকলেও ক্রান্তি ও উদীচীই ছিল প্রধান। তারা সব সময় বাম রাজনৈতিক চেতনাকে তুলে ধরতো এই গণসংগীতের মাধ্যমে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে জাতিগত ও আর্থসামাজিক মূল দ্বন্দ্বের কারণে তখন তারাও আন্দোলনে শরিক হয়। শ্রেণি বৈষম্য থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে তখন আওয়ামী লীগের মতো সমমনা দল ও প্রগতিবাদী রাজনৈতিক দলগুলো একসঙ্গে আন্দোলনে পথ হেঁটেছে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: ভাষা আন্দোলন কি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল? ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত কীভাবে এলো?

আহমদ রফিক: ভাষা আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে এই স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল বেশি, নেতৃত্বের ভূমিকা এখানে কম। এই যে ১৪৪ ধারা ভাঙা— সাধারণ ছাত্ররাই বলল, যেকোনো মূল্যে আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙব। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত নিল যে, ১৪৪ ধারা ভাঙা যাবে না, সামনেই নির্বাচন, সেই নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বৈঠকে যুবলীগের অলি আহাদ, ভাষাসংগ্রামী আব্দুল মতিন ও তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের ভিপি গোলাম মাওলা বললেন যে, সাধারণ ছাত্রদের মানাতে পারব না। ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। পরদিন সকাল বেলা আমতলায় মিটিং। এক কথায় সবাই বলল যে, ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। সিদ্ধান্ত হলো যে, ১০ জন, ১০ জন করে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মিছিলগুলো বের হতে থাকল। আর তখনই মিছিলে শুরু হলো লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ। এক পর্যায়ে বেলা ৩টা ২০মিনিটের সময় মিছিলে গুলি। গুলিতে কয়েকজন শহিদ হলেন, আহত হলেন অনেকে। তখন সমস্ত চিত্রপট পাল্টে গেল। এই গুলির খবর যেখানে যেখানে গেল সেখানেই আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া দেশের সর্বত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলো।

সারাবাংলা: ভাষা আন্দোলন শুরুর প্রেক্ষাপট এবং ৫০’র দিকে আন্দোলন স্থগিতের কারণ কী ছিল?

আহমদ রফিক: অদ্ভুদ ব্যাপার হলো- পাকিস্তান আমলে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে, সরকার উসকে দিয়েছে। সরকার যদি না উসকাতো একটি আন্দোলনও হতো না। সবকটি আন্দোলনকেই সরকার প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে আর সেগুলো আরও বেগবান হয়েছে। যেমন- নাজিম উদ্দিন সাহেব এসে বললেন, উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অমনি ভাষা আন্দোলন হয়ে গেল। পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে ব্যবহারিক ভাষা করতে বললেন। কিন্তু লিয়াকত আলী খান সেটাকে টেনে রাষ্ট্রভাষায় পৌঁছে দিলেন। সেটির জেরে ১১ মার্চের আন্দোলন হলো। এক কথায় বলতে গেলে- প্রতিটি আন্দোলন সরকার তৈরি করেছে।

সাক্ষাৎকার ২য় পর্ব:

 

ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে (৫০ সালে) সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ জিন্নাহ সাহেবের পূর্বপাকিস্তান সফর উপলক্ষে আন্দোলন স্থগিত করেছিল। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন সাহেব ৮দফা শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দিল। সবাই তা মেনে নিল। কিন্তু ওই সময় তাজ উদ্দিন সাহেব ও তোহা সাহেব বলেছিলেন- আন্দোলন যেভাবে উতুঙ্গ হয়ে উঠেছে, এটা স্থগিত করলে নতুন করে আর তৈরি করা যাবে না। তাদের দুজনের কথা কেউ শুনল না। সর্বদলীয় কমিটি ওম শান্তি বলে আন্দোলন স্থগিত করল। বলতে গেলে তখন পাকিস্তান বলতেই সবাই অজ্ঞান ছিল। কিন্তু জিন্নাহ সাহেব এসে যখন কড়া ভাষায় বললেন, উর্দূ এবং একমাত্র উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সেইটার প্রভাব জনসাধারণ ও রাজনীতিবিদ এবং ছাত্রদের একাংশের মধ্যে পড়ল। মাঝখানে সংবিধানের জন্য মূলনীতি কমিটি সুপারিশ করল যে, উর্দূ হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তখন আন্দোলন কিছুটা হলো। রাজনীতিবিদরা সেটা সমন্বয় করলেন। ওই সময় ছাত্রদের একাংশ আন্দোলনে অংশ নিল। আমিও আন্দোলনে অংশ নিয়ে নবাবপুর দিয়ে আতাউর রহমানের পাশাপাশি হেঁটেছি। সেটা ছিল ১৯৫০ সাল। খুব সীমিত আকারে আন্দোলন হয়েছিল বলে সেটা কেউ উল্লেখ করে না। তারপর থেকে একটি সুষ্ঠু আন্দোলন তৈরি করতে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো। আর সেই ৫২’র ভাষা আন্দোলনই সবদিক থেকে বিকশিত হলো।

সারাবাংলা: ভাষা আন্দোলন থেকে রাষ্ট্রভাষা, পরবর্তী সময়ে ’৬০-এর দশকের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি আমরা আর কী কী পেলাম?

আহমদ রফিক: ভাষা আন্দোলনে তিনটি স্লোগান-ই ছিল মূল হাতিয়ার— ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’। আর ২১শে ফেব্রুয়ারির পরের দিন আরেকটি স্লোগান প্রতিষ্ঠিত হলো ‘শহিদ স্মৃতি অমর হোক’। সারা দেশব্যাপী শহিদ স্মৃতি অমর করা হলো। ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে ছোট-বড় শহিদ মিনার তৈরি হলো শহিদদের স্মৃতি অমর করতে। একুশের ভাষা আন্দোলন আমাদের দুটো স্থায়ী প্রতীক উপহার দিয়েছে। একটি হলো- শহিদ দিবস বা ২১শে ফেব্রুয়ারি, আরেকটি হলো- শহিদ মিনার। এ দুটো স্থায়ী প্রতীক-ই আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এবং এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেই ইউনেস্কো শহিদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সারাবাংলা: ৫৪’র নির্বাচনে ২১ দফা দেওয়া হয়েছিল। সেটি কি ২১শে ফেব্রুয়ারিকে মাথায় রেখেই করা হয়েছিল?

আহমদ রফিক: ২১শে ফেব্রুয়ারিকে মাথায় রেখেই ২১ দফা করা হয়েছিল। এবং ২১ দফার প্রথম দফা হলো- রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সেখানে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনও ছিল এবং মওলানা ভাসানী যে কথাগুলো বলতেন—  কৃষক, তাঁতী, কামার-কুমার সবার স্বার্থ দেখতে হবে; সবার স্বার্থ পূরণ করতে হবে- এ বিষয়গুলোও ছিল। ২১ দফা একসঙ্গে করলে দেখা যাবে যে, বৈষম্যের কারণে শ্রেণিস্বার্থটা সামনে চলে এলো। আর এটি সামনে চলে আসায় এবং প্রসঙ্গটা বড় হওয়ায় এই দ্বন্দ্বটা প্রধান হয়ে উঠলো। তখন মওলানা ভাসানীর জনগণের চাহিদা পূরণের বিষয়টি পেছনে পড়ে গেল। এর মধ্য দিয়ে প্রগতিশীলরাও পিছিয়ে পড়ল। এতে জাতীয়তাবাদী চেতনাটা সামনে চলে আসল। আর জাতীয়তাবাদ চেতনার প্রতিনিধি যারা, বিশেষ করে ৬০’র দশকে আওয়ামী লীগের ধাপে ধাপে অগ্রগতি হলো। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিল এবং স্বাধীনতার পর ওই দলই ক্ষমতায় এলো। স্বভাবতই তারা ক্ষমতায় এসে শ্রেণিস্বার্থ, শ্রেণিচরিত্র ও শ্রেণিচেতনা ধরে রাখল। তারা মাওলানা ভাসানী ও প্রগতিশীলদের যে চিন্তা বা চেতনা সেই চেতনা থেকে পিছিয়ে পড়ল।

সারাবাংলা: স্বাধীনতার পর আমরা বাংলাকে সর্বস্তরের ভাষার মর্যাদা দিতে পারিনি কেন?

আহমদ রফিক: স্বাধীনতার পর ঔপনিবেশিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি প্রাধান্য পেল। এ জন্য ইংরেজির প্রধান্য সবক্ষেত্রেই দাঁড়াল। শিক্ষাক্ষেত্রে এটার প্রভাব বেশি পড়ল। সংস্কৃতির একাংশে অবশ্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবলভাবে প্রকাশ আছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বা চেতনাগতভাবে দেখা যাচ্ছে, ইংরেজির প্রাধান্য সর্বত্র। সেই ইংরেজি প্রাধান্যটাকে তো খুব সহজেই সরিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ এটি এখন মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। আমি আমার ক্যারিয়ার তৈরি করব সেখানে যদি আমার ইংরেজি প্রাধান্য না হয়, সেটি যদি রপ্ত না করতে পারি তাহলে তো সুবিধা হয় না। আর হাস্যকর একটা কথা আমরা মাঝে-মধ্যেই বলতাম যে, ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর ছাত্র এবং বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তর ছাত্র কাকে বিবাহের জন্য পাত্র হিসেবে মেয়ের বাপ নির্বাচন করবেন। সেখানে ইংরেজি বিভাগের ছাত্রই এগিয়ে থাকতেন। ওই যে ধারণা এবং চিন্তা ও মানসিকতা- এগুলো এক কথায় ঔপনিবেশিক মানসিকতা। সেই ধারণা ও চিন্তা এখনও দূর হয়নি।

সারাবাংলা: একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আপনার বর্তমান ভাবনা কী?

আহমদ রফিক: একুশ নিয়ে আমার এখন নতুন কোনো ভাবনা নেই। ভাবনা আমার একটাই- ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমরা যে স্লোগানগুলো দিয়েছিলাম, সেই স্লোগানগুলোর ভিত্তিতে ‘৬০-এর দশকের শুরুতে জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণ অর্থাৎ উদ্ভব এবং বিকাশ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেটা যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা থেকে শুরু করে ৬০’র দশকের ৬দফা, ছাত্রদের ১১ দফা, মাওলানা ভাসানীর ১৪ দফা- পরে এইসব রাজনৈতিক কারণগুলো মিলে ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১’-এ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন দেশ পেলাম। তার মধ্য দিয়ে উপহার পাওয়া গেল একটি সংবিধান। সেই সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হলো যে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা পেয়ে গেলাম। আর সে পর্যন্ত পৌঁছে আমাদের শ্রেণিস্বার্থ পূরণ হয়ে গেল বলে আমরা আর সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দিকে আর এগোলাম না। না এগিয়ে ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজি আগে জাতীয় জীবনে যেভাবে প্রচলিত ছিল সেভাবেই আমরা রেখে দিলাম। এবং সেভাবেই পথ চলতে থাকলাম। এখন একজন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে, রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে আমি স্বভাবতই বলব, এই শ্রেণিস্বার্থ পূরণের বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের এখন উচিত ওই স্লোগানগুলো বিশেষ করে ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু করা’। অর্থাৎ উচ্চ শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং উচ্চ আদালতে সর্বত্র মাতৃভাষা, সেখান থেকে রাষ্ট্রভাষা, রাষ্ট্রভাষাকে জাতীয় ভাষা এবং জীবিকার ভাষা করা দরকার। মাতৃভাষা বা রাষ্ট্রভাষা যতদিন জীবিকার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন দেশের জনগণ ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজির পেছনে ছুটবে। সেজন্য রাষ্ট্রভাষাকে জীবিকার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে ইউরোপ থেকে আমরা জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা পেয়েছি তারা বোঝে, মাতৃভাষা থেকে রাষ্ট্রভাষা, রাষ্ট্রভাষা থেকে জাতীয় ভাষা এবং জাতীয় ভাষা হবে জীবিকার ভাষা। ইউরোপের দেশগুলোতে কিন্তু জীবিকার ভাষা কিন্তু তাদের মাতৃভাষা। আমরা যদি ইউরোপের জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাটাকেই অনুসরণ করি তাহলে আমাদের উচিত মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও জীবিকার ভাষা একাকার করে নেওয়া। সেই একাকার করে নেওয়ার কাজটি শ্রেণিস্বার্থের কারণে এতদিন কোনো সরকারই করেনি। সেটির জন্য লড়াইটা বাকি রইল।

সারাবাংলা: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

আহমদ রফিক: সারাবাংলাকেও ধন্যবাদ

সারাবাংলা/পিটিএম


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button