আইন-বিচার

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর: আপিল শুনানির অপেক্ষা

কামরুল ইসলাম ফকির, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ১২ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ (২৫ ফেব্রুয়ারি)। তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মামলাটি এখন আইনি লড়াইয়ে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। গত ১২ বছরে হত্যা মামলার বিচারের দুই ধাপ শেষ হয়েছে বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে। তবে এ ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটি এখনো বিচারিক (অধস্তন) আদালতের গণ্ডি পেরোতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ওই হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ ৭৪ জন নিহত হন। এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলার বিচার হাইকোর্টে শেষ হয়ে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। কিন্তু বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটির বিচার এখনো বিচারিক আদালতেই শেষ হয়নি।

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, হত্যা মামলার শেষ ধাপটি সম্পন্ন হতে চলতি বছর শেষ হয়ে যেতে পারে। হত্যা মামলায় হাইকোর্টে খালাসপ্রাপ্ত এবং যাদের সাজা কমানো হয়েছে, তাদের সাজা বাড়াতে আপিল ও লিভ টু আপিল দাখিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের খালাস চেয়ে আপিল ও লিভ টু আপিল দাখিলও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রথমে উভয়পক্ষের লিভ টু আপিলের গ্রহণযোগ্যতার ওপর শুনানি হবে। তারপর আপিলের শুনানি ও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা ৩২টি আপিল করেছেন এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ও অন্যান্য মেয়াদে সাজাপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে আপিল করার অনুমতি চেয়ে (লিভ টু আপিল) ৩৯টি আবেদন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৭১টি আবেদন করা হয়েছে আপিল বিভাগে। এর মধ্যে আসামিপক্ষে ৫১টি এবং রাষ্ট্রপক্ষ সাজা বাড়াতে ২০টি আবেদন করেছে।

সব আবেদন দাখিল করা শেষ হলে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা মামলার সারসংক্ষেপ দাখিল করা হবে। এরপর তা আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত হয়ে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে যাবে। ফলে আপিল বিভাগে কখন এ মামলার বিচার শুরু হবে, তা নির্ভর করছে প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের ওপর। তবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে চলতি বছরেই শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ২০টি আপিল দায়ের করা হয়েছে। এটা সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আপিল। প্রায় ৫০ হাজার পৃষ্ঠার। এ কারণে আপিল ফাইল করতে একটু দেরি হয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ফাইল করেছি। আবার আসামিদের মধ্যে অনেকেই খালাস চেয়ে আপিল ফাইল করেছেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি চলতি বছরই আপিল বিভাগে শুনানি হবে। সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানি হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চূড়ান্ত আপিল শুনানির দিন নির্ধারণের জন্য আপিল বিভাগে আমরা আবেদন করব।’

বিজ্ঞাপন

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ৫১টি আপিল দায়ের করা হয়েছে। এখন নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক আসামির ক্ষেত্রে মামলার সারসংক্ষেপ তৈরি করা হবে। প্রধান বিচারপতি শুনানির দিন নির্ধারণ করবেন। চলতি বছর চূড়ান্তভাবে আপিল নিষ্পত্তি নাও হতে পারে।’

২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার পিলখানা হত্যা মামলার রায় দেন। পরে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া যাবজ্জীবন দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে। আর ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালতের সাজার বিরুদ্ধে ২৮ জন আপিল না করায় তাদের সাজা বহাল রাখা হয়। সব মিলিয়ে ৫৫২ জনকে সাজা দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ে ২৮৩ জনকে খালাস দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে যাদের সাজা খাটা হয়ে গেছে তারাও মুক্তি পাচ্ছেন না। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার আসামি হওয়ায় ওই মামলার বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় তারা এখনো কারাবন্দি।

বিজ্ঞাপন

এর আগে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর এ মামলায় ১৫২ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন বিচারিক আদালত। তাদের একজন ছাড়া সবাই তৎকালীন বিডিআরের সদস্য। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১৬১ জনকে। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পান আরও ২৫৬ জন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন। মোট ৫৬৮ জনের সাজা হয়।

সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে বিস্ফোরক মামলা:

বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ১ হাজার ৩৪৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৮৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। এ মামলায় আসামি ৮৩৪ জন। তাদের মধ্যে ৩৩ আসামি ইতোমধ্যে মারা গেছেন এবং ২০ আসামি পলাতক। ৭৮১ আসামি কারাগারে আছেন। বিস্ফোরক মামলাটি নিম্ন আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়ে রায় প্রদানে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এ মামলায় আগামী ২৩ ও ২৪ মার্চ সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে। বিচারকাজ চলছে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদরাসা সংলগ্ন মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে।

সারাবাংলা/কেআইএফ/এমআই


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button