ফিচার

নারী দিবস এবং বাংলাদেশের নারী

আঞ্জুমান রোজী

নারী দিবসের গুরুত্ব, মাহাত্ম অনেকের কাছে খুবই হেয় করার মতো এবং গৌণ মনে হয়। এমন কি বুদ্ধিজীবী যারা অর্থাৎ কবি, সাহিত্যিক, লেখকদের মধ্যেও কেউ কেউ বলেন, এখন আর নারী দিবসের দরকার কি? নারী দিবসের দরকার কি কথাটার উত্তর গুরুত্বসহকারে দিতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব কি! বিজয়দিবসের গুরুত্ব কি! মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্ব কি! আমরা কেন এসব দিনগুলো গুরুত্বসহকারে পালন করি! কেন এর মর্মার্থ তুলে ধরি! কেন বারবার স্মৃতির দরজায় টোকা দিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলি। যেন মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট না হয়। মানুষ যেন বুঝতে পারে তার শিকড় কোথায়। যতই এই শিকড়ের সন্ধান মানুষ করবে, শিকড়ের কাছে বারবার ফিরে যাবে ততই মানুষ তার অবস্থানকে মজবুত করবে এবং চিন্তা-চেতনার জায়গাকে শাণ দেবে। সেইসঙ্গে জীবনকে ঋদ্ধ করবে। বুঝে নেবে তার করণীয়, দিব্যচোখে দেখে নেবে ভবিষ্যত। যার জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের শুরু বা শিকড়টা বারবার বুঝে নিতে হয়। নারী দিবস সেই অর্থে গুরুত্ব রাখে সর্বাগ্রে।

বিজ্ঞাপন

নারী অধিকার, নারী সচেতনতার মূলমন্ত্র নারী দিবস। এই দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরতে হলে তার ইতিহাসকে প্রথমে তুলে ধরতে হবে। এই ইতিহাসও রক্তাক্ত, আছে জেল-জুলুম, হত্যা। এই ইতিহাস, নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ সালে খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি, নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে।”

এক এক প্রান্তে নারী দিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য এক এক রকম হয়। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মূখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও নারীদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া বেশি গুরুত্ব পায়। তৃতীয় বিশ্বে নারীর আর্থিক মুক্তি এবং নারীর সচেতনতা বৃদ্ধির দিকটি বেশি গুরুত্ব পায়; গুরুত্ব পায় নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধির বিষয়টি। এই দিকগুলো মাথায় রেখে সচেতন নারীরা আন্দোলন, প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন। দৃশ্যত নারীরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারছে না অস্থির রাজনীতি আর ধর্মীয় আগ্রাসনের কারণে। তারপরেও পরিবর্তন যে একেবারে আসছে না তা নয়, ধীরে হলেও আসছে। প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়েও নারীরা জেগে উঠছেন। নারীশিক্ষার হার যেদেশে বেশি সেদেশই সর্বাংশে উন্নতির সোপানে আছে। তাছাড়া নারী দিবসের গুরুত্ব শুধুমাত্র নারীর জন্য ভাবলে ভুল হবে, এরসঙ্গে জড়িত পুরো মানবজাতি। কারণ, নারীই হলো সৃষ্টির মূলের কারিগর। নারী শিক্ষিত মানে পুরো মানবজাতি শিক্ষিত।

বিজ্ঞাপন

সেই অর্থে বাংলাদেশের চিত্র লক্ষ্য করলে বোঝা যায় নারীর অবস্থানটা আসলে কোথায়। এখানে নারীকে অবলা ভেবেই মূল্যায়ন করা হয় বেশি। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র একই দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে। নারী পুরুষের মুখাপেক্ষী হয়ে চলবে বা থাকবে, এটাই হলো বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের মানসিকতা। এই মানসিকতার বেড়াজাল ভেঙে নারী এখন বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। নারী নিজেও একক সত্তা, তা বুঝিয়ে দেওয়ার সবরকম কৌশল নারী এখন খাটাচ্ছে। অকপটে নিজেকে উগরে দিচ্ছে, লেখায়, কথায়, কাজে; বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরাও পারি। যদিও ধর্মীয় মৌলবাদী গুষ্টি নারীর চলার পথে চরম বাঁধা হয়ে আছে। তবে এ বাঁধার প্রাচীর একদিন সচেতন নারীকুল ভাঙবেই- এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যেটুকু পরিবর্তন এসছে নারীর জীবনে, তার সিংহভাগেরই ইতিবাচক দিক আছে বলে আমি মনে করি। অনেকে মনে করেন, বেগম রোকেয়া যেভাবে নারীকে শিক্ষা, দীক্ষায়, সচেতনতায় স্বয়ম্ভর করে তুলতে চেয়েছেন, সেই অর্থে নারী এগিয়ে যায়নি। কিন্তু রেগম রোকেয়ার সেই দীক্ষা কেউ কেউ এখনো বহন করছে বলে নারী সচেতনতার দ্যুতি চারদিকে ছড়াচ্ছে। তবে বাস্তবতা বলে বেশিরভাগ নারীই নারীস্বাধীনতা নামে স্বেচ্ছাচারিতায় ভুগছে। হয়তো এভাবেই নারী তার অবস্থান দৃঢ় করছে, হয়তো এভাবেই নারী প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে। পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে হলে কোনো কোনো নারী মনে করেন, নারীকেও কখনো কখনো স্বেচ্ছাচারী হতে হয় বৈকি। একে নেতিবাচক অর্থে যেভাবে দেখা হয়, তার থেকে ইতিবাচক দিকগুলো খুঁজলে নারীর সমস্যাগুলো অনুধাবন করা যাবে, যা থেকে নারীর চলার দিকনির্দেশনা বের করা সম্ভব। তবে সবকিছুই সময়ের ওপর নির্ভর করে। ভাঙাচোরার মধ্য দিয়েই একটি অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। বাংলাদেশ হয়তো সেই সন্ধিক্ষণেই আছে। একদিন বাংলাদেশের নারীও জেগে উঠবেই এবং নারী দিবসের মর্মার্থ ধারণ করেই নারী এগিয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আরএফ


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button