ফিচার

‘নারী-পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ দেখি না’

শেখ জাহিদুজ্জামান

ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন আকাশে উড়বেন জহুরা মাহ্জাবীন মন্দিরা। বিশাল নীল আকাশের বুকে পাখির মতো ডালা মেলে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াবেন। সেই স্বপ্ন সত্যি হওয়াটা ছিলো অনেক কষ্টের। দাদি চাইতেন তার নাতনি পাইলট হবে। মাত্র ২০ বছর বয়সে পাইলট হন। সত্যি করেন দাদির স্বপ্ন। কিন্তু দাদী আর তা দেখে যেতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশ বিমানের নারী পাইলট জহুরা মাহজাবীন মন্দিরার সঙ্গে কথা বলেছেন সারাবাংলা ডট নেটের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শেখ জাহিদুজ্জামান

সারাবাংলা: পাইলট হওয়ার স্বপ্নটা কিভাবে এলো এবং কার অনুপ্রেরণা ছিলো?
মন্দিরা: ছোটবেলায় যখন বিশাল আকাশের বুকে একটা বিমানকে পাখির মতো উড়ো বেড়াতে দেখে খুব ভালো লাগতো। আমি ছোটবেলায় বেশির ভাগ সময় আমার দাদির সাথে কাটিয়েছি। দাদির সঙ্গে আমি নাচ শিখতে যেতাম। বিজয় সরণি দিয়ে যখন যেতাম, তখন মোড়ে থাকা বিমানটি দেখে আমি দাদিকে বলতাম, বড় হয়ে এই বিমানে করে তোমাকে ঘুরাবো। ছোটবেলার সেই তীব্র ইচ্ছাটা আমাকে সফলতা দিয়েছে। এছাড়া আমার দাদির শেষ ইচ্ছে ছিলো আমি পাইলট হবো। এরপর দাদি মারা যান। কিন্তু বাবাকে শেষ ইচ্ছের কথাটা বলে যান। এরপর আমাকে না জানিয়ে আমার বাবা অ্যারিয়্যাং ফ্লাইং স্কুল থেকে আমার জন্য অ্যাডমিশন ফর্ম নিয়ে আসেন। কিন্তু মা চাইনি আমি পাইলট হই। কারণ আমার কিছু হলে তারা কি নিয়ে বাঁচবে। তার মানে এটা নয়, মা চায়নি আমি ভালো কিছু করি। কিন্তু মায়ের মধ্যে সবসময় একটা ভয় কাজ করতো। সবমিলে আমার অনুপ্রেরণা আমার দাদি। এরপর বাবা-মায়ের সবসময় সহযোগিতা না থাকলে হয়তো আমার পক্ষে এতোদূর আসা সহজ ছিলো না।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: পাইলট হওয়ার প্রথম দিনের মুহুর্তটা কেমন ছিলো?
মন্দিরা: ইউনিফর্ম পরার সাথে সাথে একটা দায়িত্ববোধ চলে আসে। আমি প্রথম রিজেন্ট এয়ারওয়েজে জয়েন করি ২০১৫ সালে। তখন আমার বয়স মাত্র ২০ বছর। দায়িত্বটা হচ্ছে একসাথে অনেক যাত্রীকে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছে দেওয়া। নিরাপদে এবং নিরাপত্তার সাথে। আর ইউনিফর্মের যে অনুভূতি সেটা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। আমার প্রথম বিমান ছিলো ড্যাশ ৮ কিউ ৩০০। এরপর বোয়িং ৭৩৭, টেসলা ১৫২ ও সাইরাস। ফ্লাই করেছেন, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, দোহা, দাম্মাম, মাসকাটসহ বিভিন্ন দেশ।

সারাবাংলা: নারী দিবসে নারীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলেন?
মন্দিরা: কোন কিছুই একজন নারীর পক্ষে অসম্ভব না। একজন নারী বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে। যা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। একজন নারী যদি বাচ্চা জন্ম দিতে পারে তাহলে সে দুনিয়ার সকল কাজ পারবে। শুধু নারীদের দরকার একটু সাহস এবং আত্মবিশ্বাস। নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব কাজ করে। তবে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য আমরা নিজেরাই তৈরি করে নেই। একটি ছেলে যে কাজ করে একটি নারীও সেই কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

আমি নিজেও যখন ফ্লাই করতাম প্রথমে অনেক অবহেলার শিকার হয়েছি। অনেক যাত্রী বলেছেন এই মেয়ে পারবে তো? এমন আরও অনেক কিছু আমাকে ফেস করতে হয়েছে। কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মাঝে মাঝে অনেক খারাপ লাগতো। আমাদের কালচারের জন্য নারীরাই নারীদের হতাশ করে তোলেন। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা নারীরাই নারীদের ছোট করে ফেলি অনেকসময়। যেখানে নারীরাই নারীদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সেখানে হতাশ হতে হয় অনেকের ব্যবহারে।

সারাবাংলা: বাংলাদেশে নারীদের জন্য বিমানচালনা পেশা কতটা নিরাপদ?
মন্দিরা: নিরাপত্তা বলতে আমি বলব সেটা নিজের কাছে। আমি যেখানেই কাজ করি না কেন সেখানে ঝুঁকি রয়েছে। একটা মেয়ের জন্য পাইলট হওয়া অবশ্যই ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জের। আমাদের গার্মেন্টেসের লেবার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীও নারী। প্রধানমন্ত্রী যদি একটি দেশ চালাতে পারেন সেখানে আমি কেন একটি বিমান চালাতে পারবো না। পুরুষ যদি কোন কাজ করতে পারে, নারীরাও পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি নারী পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ দেখি না।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: পাইলট হতে গেলে কি কি কোর্স করতে হয়?
মন্দিরা: পাইলট হতে গেলে দুটি কোর্স করতে হয়। একটি পিপিএল (প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স) অন্যটি সিপিএল (কর্মাসিয়াল পাইলট লাইসেন্স)। বাংলাদেশে ৩ টি ফ্লাইং স্কুল রয়েছে। সেইসব স্কুল থেকে প্রাইভেট পাইলট ট্রেনিং নেওয়া যায়। তবে কর্মাসিয়াল পাইলট ট্রেনিং নিতে গেলে অবশ্যই বিদেশে যেতে হয়।

সারাবাংলা: পাইলট জীবনে আপনার স্মরণীয় মুহুর্ত কোনটি?
মন্দিরা: ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল। ঢাকা টু যশোর ফ্লাইট ছিলো। বিমানে যাত্রী ছিলো ৫৬ জন। আবহাওয়া প্রথম থেকেই খারাপ ছিল। সেজন্য দুই ঘণ্টা দেরিতে ফ্লাইট উড্ডয়ন করে। কিন্তু ফ্লাইট উড্ডয়নের পরে বিমানের ওয়েদার রাডার কাজ করছিল না। আমরা তখন বুঝতে পারছিলাম না কি করব। তখন আমি এবং আমার ক্যাপ্টেন আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যশোর বিমানবন্দরে নিরাপদে বিমানটি ল্যান্ড করাতে সক্ষম হই। ৩ জন যাত্রীর অবস্থা খুব খারাপ ছিলো। তবে তারা হাসপাতালে সেবা নিয়ে পরদিনই বাড়িতে ফেরেন। এটা ছিলো আমার পাইলট জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু স্মরণীয় ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: পারিবারিক জীবন ও শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন?
মন্দিরা: আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা মা ছাড়া পরিবারে আমার ৪টি বেড়াল রয়েছে। ৬ বছর ধরে তারা আমার সঙ্গে আছে। মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে প্রাইভেটে ‘এ’ লেভেল শেষ করার পর ভর্তি হই অ্যারিয়্যাং ফ্লাইং স্কুলে। সেখান থেকে ২০১২ সালে লাইসেন্স পাই। ২০১৪ সালে যোগ দেই রিজেন্ট এয়ারলাইন্সে। একই সঙ্গে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করছি।

সারাবাংলা: ধন্যবাদ আপনাকে।
মন্দিরা: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সারাবাংলা/এসজে/আরএফ


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button