স্বাস্থ্য

ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে যা বলছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি ভ্যাকসিন প্রয়োগ কর্মসূচি স্থগিত রেখেছে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে রক্ত জমাট বাঁধার কারণ দেখিয়ে দেশগুলো সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সর্বশেষ দেশ হিসেবে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি ভ্যাকসিন প্রয়োগ স্থগিত রেখেছে। তবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকোর তৈরি ভ্যাকসিন গ্রহণের পরে রক্ত জমাটের ঝুঁকি বাড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১৫ মার্চ) এক বিবৃতিতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের সঙ্গে রক্ত জমাটের ঝুঁকি বাড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ইউরোপে এক কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র ৩৭টির মতো রক্ত জমাটের ঘটনা ঘটেছে এবং যারা এই ভ্যাকসিন নেয়নি তারাও একই সময়ে সমান সংখ্যায় রক্ত জমাটের শিকার হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই ভ্যাকসিন প্রদানের ফলে যে কোনো দেশের, যেকোনো গোষ্ঠীর বা যেকোনো লিঙ্গের কারও মধ্যে পালমোনারি এম্বোলিজম, ডিপ ভেইন থ্রোম্বোসিস (ডিভিটি) বা রক্ত জমাট বাধা বা এর ঝুঁকির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিবৃতিতে কোম্পানির প্রধান মেডিকেল অফিসার অ্যান টেইল বলেন, ইউকে এবং ইইউতে প্রায় এক কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যেই আমাদের ভ্যাকসিন নিয়েছেন। এমনিতেই শত শত মানুষ স্বাভাবিক সময়েই রক্ত জমাটের শিকার হন। সেই তুলনায় ভ্যাকসিন নেওয়া মানুষদের মধ্যে রক্ত জমাটের সংখ্যা অনেক অনেক কম।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, মহামারির কারণে বিচ্ছিন্ন প্রতিটি ঘটনার ওপর এখন নজর অনেক বেশি, এবং “মানুষের নিরাপত্তার জন্য অনুমোদিত ভ্যাকসিনের প্রতিক্রিয়ার ওপরও স্বাভাবিক এবং প্রচলিত নজরদারির চেয়ে অনেক বেশি নজরদারি হচ্ছে।“

এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির প্রকাশিত এক সংবাদে প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক মিশেল রবার্টস বলেছেন, দ্রুতগতিতে গণহারে মানুষকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। ভ্যাকসিন নিয়েও অনেক মানুষই নানান ধরনের রোগে আক্রান্ত হবেন; যার সঙ্গে এই ভ্যাকসিনের কোনো সম্পর্কই নেই।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলছেন, কিছু দেশ অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন স্থগিত করছে এ কারণে নয় যে এটি বিপজ্জনক। বরং সেসব দেশের বিশেষজ্ঞরা দেখতে চাইছেন কেন ভ্যাকসিন নেওয়া কিছু মানুষের শরীরে রক্ত জমাট হলো।

মিশেল রবার্টস বলেন, ভ্যাকসিন নেওয়ার পরপরই যদি বড় কোনো অসুস্থতা দেখা দেয়, তাহলে তা নিয়ে উদ্বেগের যথার্থ কারণ থাকতে পারে। কিন্তু অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়নি।

বিজ্ঞাপন

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত এই ভ্যাকসিনের বিষয়ে চলমান উদ্বেগ প্রশমিত করতে সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ভ্যাকসিনের ডোজ গ্রহণের সঙ্গে রক্তজমাট বাঁধার কোনো সম্পর্ক নেই। ভ্যাকসিনটির ব্যবহার চালিয়ে যেতে দেশগুলোকে অনুরোধ করেছে জাতিসংঘের এই স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুরোধ সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে।

নেদারল্যান্ডস এখন বিশ্বের সপ্তম দেশ যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেওয়া স্থগিত করেছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, সাবধানতার জন্য আপাতত ২৯ মার্চ পর্যন্ত এই ভ্যাকসিন দেওয়া স্থগিত থাকবে।

বিবিসিতে প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায় নেদারল্যান্ডসের স্বাস্থ্যমন্ত্রী উগো দ্য জং এক বিবৃতিতে বলেছেন, ভ্যাকসিন নিয়ে কোনো সন্দেহ দেখা দিলে তা আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। আমাদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, সুতরাং এই ভ্যাকসিন আপাতত স্থগিত রাখা সঠিক এবং সুচিন্তিত।

এদিকে ইউরোপের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইমা- যারা রক্ত জমাট বাধার ঘটনাগুলো তদন্ত করছে তাদের বক্তব্য, এই ভ্যাকসিন নেওয়ার সুফল সম্ভাব্য ঝুঁকির চেয়ে অনেক বেশি।

ব্রিটেনের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের কারণেই যে রক্ত জমাটের ঘটনা ঘটেছে তার কোনো প্রমাণ নেই। ব্রিটিশ নাগরিকদের উদ্দেশে তারা বলেছে, ডাক পেলেই যেন তারা ভ্যাকসিন নিয়ে নেয়।

এর আগে আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, বুলগেরিয়া, আইসল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডও অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন প্রয়োগ স্থগিত করা হয়।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ডোজ ব্যবহার স্থগিত করার বিষয়টি স্বীকার করেছে ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি। তবে তারা বলছে, রক্ত জমাট বাধা সংক্রান্ত এই বিষয়টির তদন্ত চলমান থাকাকালীনও ভ্যাকসিন প্রয়োগ কর্মসূচি চালানো যেতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন রক্ত জমাট বাঁধা সৃষ্টি করছে এমন কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বাস করে, এই ভ্যাকসিনের সুবিধা তার ঝুঁকিকে ছাড়িয়ে যাবে।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনবিসি এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম বিবিসি’র প্রতিবেদনে লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের ফার্মাকোপিডিমাইওলজির অধ্যাপক স্টিফেন ইভান্স বলেন, কোভিড স্পষ্টতই জমাট ব্যাধি সৃষ্টি করে এবং প্রতিটি ভ্যাকসিনই কোভিড রোগকে প্রতিরোধ করে।

তিনি বলেন, এটি খুবই বিশ্বাসযোগ্য যে ভ্যাকসিনের উপকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবেই জমাট ব্যাধিগুলির যেকোনো ঝুঁকিকে ছাড়িয়ে যায় এবং ভ্যাকসিনটি মৃত্যুসহ কোভিডের কারণে সৃষ্ট অন্যান্য অসুস্থতাকেও প্রতিরোধ করে।

ইভান্স বলেন, ভ্যাকসিন এবং রক্ত জমাট বাধার সমস্যা নিয়ে গবেষণা করা ‘সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত’ তবে তিনি এটাও বলেছেন, এই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা খুব দূরের একটি পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে; যা রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ভ্যাকসিন গ্রহণ বন্ধ করে দেবে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বিশ্বের ৬৫টি দেশ এবং অঞ্চলে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকোর এই ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শুধু এই ভ্যাকসিনটিই ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৩১ দিনে মোট ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৪৪ লাখ ৮৫ হাজার ৯৫৪ জন। এর মধ্যে কেবল রাজধানী ঢাকায় ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৭ লাখ ২৩ হাজার ৪৯৫ জন। আর ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহীদের নিবন্ধন সংখ্যা পেরিয়ে গেছে ৫৭ লাখ।

সারাবাংলা/এসবি/এএম


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button