ফিচার

কিশোর মুজিবের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা

ফিচার ডেস্ক

ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের কথা ভাবতেন। তাদের জন্য বাংলার এক প্রাপ্ত থেকে আরেক প্রাপ্ত ছুটেছেন। কখনো গরীব, দুঃখীদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কখনো  দিয়েছেন মুক্তির মন্ত্র। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির সব স্বাধীকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ জাতির যেকোন প্রয়োজনে কাণ্ডারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এসব করতে গিয়ে তাকে বার বার কারাবরন করতে হয়েছে। তারপরও থেকে থাকেননি বঙ্গবন্ধু।

বিজ্ঞাপন

শেখ মুজিবুর রহমান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ঢাকার পল্টনে জনসভা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দাবি করে ২১ দফা ঘোষণা করা হয়। ২৫ আগস্ট করাচীতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান নয় পূর্ব বাংলা বা বাংলা নামে ডাকার কথা বলেন।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ও সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর। এর ৪ দিন পর ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস জেলখানায় থাকার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হলেও আবারো জলেগেট থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সামরিক শাসন ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠন করেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে একটি গোপন সংগঠন। ১৯৬২ সালে বিরোধীদলীয় মোর্চা জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হলে এর পক্ষে জনমত গঠনের জন্য সারা বাংলা সফর করেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৬৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে তার নেতৃত্বেই গঠিত হয় দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি। এরপর আইয়ুববিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এরপর আসে ১৯৬৬। বাঙালির মুক্তির আন্দোলন আরো বেগবান হয় যখন ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বঙ্গবন্ধু বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ, ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এরপর ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সারাদেশে শুরু করেন গণসংযোগ। এসময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাকে বার বার গ্রেপ্তার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামিসহ ৩৫ জন বাঙালি ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেয়া হয় ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি। মুক্তি পেয়ে আবারো কারাবন্দি হন বঙ্গবন্ধু। তবে এ মামলার আসামিদের মুক্তির দাবিতে উত্তাল হতে থাকে সারাদেশ।

বিজ্ঞাপন

জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য আসামিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার। পরদিনই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র মুক্তি পরিষদের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করা হয়। প্রায় দশ লাখ ছাত্র জনতার সেই সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমান ভূষিত হন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে।

সামরিক শাসন জারির পর ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধু বলেন, “জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি-আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান‘-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।”

বিজ্ঞাপন

সত্তরের সাধারন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ সারাবাংলায় হরতাল পালিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান। ৭ মার্চ রেসকোর্স থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’।

এরপর ২৫ মার্চ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে নানা আলোচনা-বৈঠক হলেও ব্যর্থ হয়। ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু সেদিন রাত ১২ টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইংরেজিতে পাঠানো ঘোষণায় তিনি বলেন,

“এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।”

এই ঘোষণা বাংলাদেশের সব জায়গায় ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে পাঠানো হয়। সেইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বাংলায় একটি বার্তা পাঠান- “পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোস নাই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতারিত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লেখকদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ্ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।”

বঙ্গবন্ধুর এই বার্তাও তাৎক্ষণিকভাবে সারাদেশে পাঠানো হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাত ১ টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে।

এদিকে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির সংগ্রামে। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে  প্রধানমন্ত্রী করে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফায়সালাবাদ জেলে বঙ্গবন্ধুর গোপনে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘোষণা হয়।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। এরপরই ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদানের জোর দাবি জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু। আর দেশে ফিরেই প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশকে গড়ে তুলতে কাজ করার আহবান জানান।

১২ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরর দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। নতুন স্বপ্ন আর উদ্দীপনা নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে শুরু করেন আরেক সংগ্রাম। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারসহ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশকে পিছিয়ে দেওয়া হয় বহুবছর।

এমন মহানায়ক আর পায়নি বাঙালি। দেশের প্রতি দেশের মানুষের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায় অসমাপ্ত আত্মজীবিনীতে, “একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।”

সারাবাংলা/এসবিডিই


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button