জাতীয়

ঢাকা-মালে নতুন দিগন্তের সূচনা

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ’র বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে তার উপস্থিতিতে চারটি সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশ-মালদ্বীপ দুই দেশের সরকার প্রধান দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরস্পর একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

শুধু তাই নয়— বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও সংযোগ বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে ঢাকা ও মালে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে জাতির পিতার ১০১তম জন্মবার্ষিকীর দিন বুধবার (১৭ মার্চ) সকালে দুই দিনের সফরে ঢাকা পৌঁছান মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ। ফার্স্ট লেডি ফাজানা আহমেদসহ তার ঢাকা সফরে সঙ্গী ছিলেন দেশটির কয়েকজন মন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- বাংলাদেশ-মালদ্বীপ ৪ সমঝোতা স্মারক সই

বুধবার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র, সংস্কৃতি, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ খাতের চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

বিজ্ঞাপন

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে পারস্পারিক বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এ সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও গভীর হয়েছে। মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি সলিহ’র বাংলাদেশ সফর দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে।’

বিজ্ঞাপন

ঢাকা-মালে নতুন দিগন্তের সূচনা

মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল্লাহ শহিদ বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, প্রগতি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে আমরা দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করব। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এই শতকের অর্থনৈতিক হাব, দুই দেশ একসঙ্গে থেকে একে কাজে লাগাতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থে ও উন্নয়নের খাতিরে আমাদের মধ্যে আরও গভীর সংযোগ ঘটাতে হবে। শুধু সরকারেরই মধ্যেই নয়, বেসরকারি পর্যায়ের ব্যবসায়ী এবং দুই দেশর মানুষের মধ্যে সংযোগ আরও বাড়াতে হবে।’

ঢাকা-মালে নতুন দিগন্তের সূচনা

দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বৈঠক শেষে যৌথ একটি বিবরণী প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সেখানে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি সলিহ’র মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই নেতা দেশ দুইটির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করেন এবং উভয় দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোতে পারস্পারিক সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, মালদ্বীপে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ, মানবসম্পদ ও যুব সম্প্রদায়ের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ঔষধ সামগ্রী, কৃষি, সামুদ্রিক সম্পদ ও মৎস্য, পর্যটন, সংস্কৃতি, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিমান ও নৌ-যোগাযোগ বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রশমন।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসঙ্গে যৌথ বিবরণীতে বলা হয়, বৈঠকে শেখ হাসিনা ও ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্ভাবনা উন্মোচনের ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ মালদ্বীপের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের বিভিন্ন সামগ্রী আমদানি করতে মালদ্বীপের প্রতি আহ্বান জানান। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিষয়ক সমস্যা দূর করতে এক্ষেত্রে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দুই দেশের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠানের বিষয়ে দুই দেশের সরকার একমত হয়েছে। শুল্ক সহযোগিতা ও দ্বৈত কর পরিহার বিষয়ক প্রস্তাবিত চুক্তি সইয়ের বিষয়টি দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে উভয় পক্ষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া মালদ্বীপের রাজধানী মালে ও বাংলাদেশের তিনটি সমুদ্রবন্দরের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক জাহাজ চালু করতে চুক্তি সইয়ের বিষয়েও দুই নেতা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঢাকা-মালে নতুন দিগন্তের সূচনা

মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে বিবরণীতে বলা হয়, ‘মালদ্বীপের মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদানে বাংলাদেশের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। মালদ্বীপের শান্তিরক্ষীদের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশনস ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’

মালদ্বীপের প্রবাসী বাংলাদেশি সম্পর্কে যৌথ বিবরণীতে বলা হয়, দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসীদের বিনামূল্যে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রয়োগে মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভ্যাকসিন প্রয়োগে সহায়তার জন্য বাংলাদেশের ১৮ সদস্যের চিকিৎসক ও নার্সের একটি দল মালদ্বীপে পাঠানো হয়েছে। মালদ্বীপের চিকিৎসক ও নার্সের চাহিদা মেটানোর জন্য দেশটিতে বাংলাদেশি চিকিৎসক ও নার্স পাঠানোর অনুরোধ করেছেন রাষ্ট্রপতি সলিহ।

যৌথ বিবরণীতে আরও বলা হয়, ‘মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি দুই দেশের অর্থনীতিতে মালদ্বীপে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদানের প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালদ্বীপে অনিয়মিত শ্রমিকদের দ্রুত নিয়মিতকরণের অনুরোধ করেন। মালদ্বীপের আরও দক্ষ জনবল প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ তা সরবরাহ করতে প্রস্তুত আছে বলেও জানান।’

ঢাকা-মালে নতুন দিগন্তের সূচনা

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে শেখ হাসিনা ও ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ জাতিসংঘ, ক্লাইমেট ভারনাবল ফোরামসহ (সিভিএফ) বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় বিবরণীতে। এতে বলা হয়, ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সভাপতি পদে মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন নিশ্চিত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অঞ্চলিক অফিসের আঞ্চলিক পরিচালক পদে ২০২৩ সালের জন্য বাংলাদেশি প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন দেওয়ার জন্য মালদ্বীপকে ধন্যবাদ জানানো হয়।

রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতেও বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রত্যয় জানিয়েছে মালদ্বীপ। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সলিহ মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষে মালদ্বীপের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে উল্লেখ করেছেন।

সারাবাংলা/জেআইএল/টিআর


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button