লাইফস্টাইল

ছাদে বিষমুক্ত আবাদ

আহসান রনি

ছাদবাগানের গাছগুলো তুলনামূলক কম মাটিতে বেড়ে ওঠে। আবার অল্প জায়গায় বেশি সংখ্যক গাছ লতা গুল্মে আচ্ছাদিত হয়ে একটি বাগান গড়ে উঠে। তাই ছাদবাগানে রোগবালাই এর প্রকোপ, আক্রমণ ও সংক্রমণও তুলনামূলক বেশি। আবার অনেকে বাজারের কেমিক্যালযুক্ত ফল ও সবজির ভীড়ে ছাদে বিষমুক্ত চাষাবাদের চেষ্টা করেন। বিষমুক্ত চাষের জন্য কোন ধরনের রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ না করেও গাছের  পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন করা যায়।  আবার শুধুমাত্র গৃহস্থালির জৈব উপকরণ ব্যবহার করে গাছের খাবার ও পুষ্টির যোগান দেওয়া যায়। কীভাবে ছাদে বিষমুক্ত আবাদ করা যায়, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি এবারের লেখায়।

বিজ্ঞাপন

রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ না করে ঘরের কিছু উপাদান দিয়ে গাছের পোকা ও রোগ দমন করা যায়। যেমন,

আদা

বিজ্ঞাপন

জৈব বালাইনাশক হিসেবে আদা খুবই কার্যকর। মাত্র ৫০ গ্রাম আদাবাটা আধা লিটার গরম পানিতে মিশিয়ে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে প্রস্তুত হয়ে যায় খুব শক্তিশালী একটি জৈব বালাইনাশক। এটি গাছের ছত্রাক থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগজীবাণুর আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করতে পারে। আদাবাটার এই মিশ্রণটি সপ্তাহে একবার করে প্রয়োগ করলে বেশি সুফল পাওয়া যায়।

রসুন ও নিমপাতা

বিজ্ঞাপন

জৈব বালাইনাশক হিসেবে রসুন ও নিমপাতার ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। মাত্র ৫০ গ্রাম রসুনবাটা ও এক মুষ্ঠি নিমপাতা এক লিটার পানিতে মিশিয়ে ৩ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলেই তৈরি হয়ে যায় কার্যকরী এক বালাইনাশক। এই জৈব মিশ্রণটি সপ্তাহে একবার করে প্রয়োগ করলে আশানরুপ সুফল পাওয়া যায়।

মরিচ

বিজ্ঞাপন

মাত্র ৫০ গ্রাম রসুনবাটা ও ৫ টি কাচামরিচ বাটা এক লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এই মিশ্রণটি খুবই কার্যকরী বালাইনাশক হিসেবে কাজ করে। এটি সপ্তাহে একবার প্রয়োগ করে ছাদবাগানের বিভিন্ন রোগবালাই থেকে প্রতিকার পাওয়া যায়।

তামাক

বিজ্ঞাপন

রসুনের পাশাপাশি তামাকও আবহমানকাল থেকে গ্রামীণ কৃষিতে একটি কার্যকরী জৈব বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর এক্ষেত্রে ব্যবহৃত সিগারেটের গোড়ালির অংশে জমে থাকা তামাককেই কাজে লাগানো যায়। মাত্র ৫০ গ্রাম রসুনবাটা ও এক মুষ্ঠি সিগারেটের গোড়ালির অংশ এক লিটার পানিতে মিশিয়ে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এই মিশ্রণটি বেশ শক্তিশালী ও মাত্র ১৫ দিন অন্তর প্রয়োগ করলে আশানুরুপ ফল পাওয়া যায়।

এছাড়াও ছাদবাগানের বেশিরভাগ গাছেই মাঝেমধ্যে পুষ্টি ঘাটতি দেখা যায়। এর ফলে পাতা ফ্যাকাসে, হলুদ বা কালচে বর্ণ ধারণ করে। আবার পাতার শীর্ষ বা কিনারায় বিভিন্ন আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এসব পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ঘরে সবসময় থাকে এমন কিছু উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে।

মরিচা

১০০ গ্রাম পরিমাণ মরিচা পড়া পুরনো পেরেক ২০০ গ্রাম পানিতে ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে পানিটি লৌহ পুষ্টির মিশ্রণ হিসেবে প্রস্তুত হয়ে যায়। এরপর পানি থেকে লোহাগুলো আলাদা করে সেই পানি প্রতি ১৫ দিনে একবার করে প্রয়োগ করতে পারেন। এতে গাছে লৌহের ঘাটতি অনেকটা পুরণ করা যায়।

ব্যবহৃত চা পাতা ও ডিমের খোসা

চা পাতা ও ডিমের খোসায় আছে গাছের জন্য উৎকৃষ্ট পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন-N, ফসফরাস- P ও পটাশিয়াম-K এর পরিমিত মিশ্রণ। ব্যবহৃত চা পাতা ভালোভাবে ধুয়ে, শুকিয়ে নিন। চারটি ডিমের খোসা ভালোভাবে গুঁড়া করে এর সাথে ১০০ গ্রাম চা পাতা মিশিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে গাছের জন্য উৎকৃষ্ট এনপিকে সার। আর এই সার প্রতি মাসে একবার করে প্রয়োগ করলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়।

খৈল

খৈল গুঁড়াও একটি উৎকৃষ্ট এনপিকে জৈব সার। প্রথমে খৈল ভালোভাবে গুঁড়া করে নিতে হবে। এরপর ৮ ইঞ্চি টবের জন্য ৪ চা চামচ ও ১০ ইঞ্চি টবের জন্য ৫ চা চামচ হারে টবের কিনারা বরাবর ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর মাটি খুঁচিয়ে তা মিশিয়ে দিতে হবে ও পরে সেচ দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে ১৫ দিনে একবার করে প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া যাবে।

শুকনো গোবর

এটি থেকে তরল জৈব সার প্রস্তুত করা যায়। এজন্য প্রথমে শুকনো গোবর ভালোভাবে গুঁড়া করে নিতে হবে। এরপর ১০০ গ্রাম গোবর গুঁড়া ৩০০ গ্রাম পানির সাথে মিশিয়ে ১ দিন রেখে দিতে হবে। মিশ্রণটি ১৫ দিনে একবার করে গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করলে আশানুরূপ সুফল পাওয়া যায়।

ফিটকিরি

ছাদ বাগানের গাছে পিঁপড়া খুবই সাধারণ সমস্যা। গাছের পিঁপড়া দমনে প্রথমেই কিছু ফিটকিরি গুঁড়ো করে নিতে হবে। আধা চা চামচ ফিটকিরি গুঁড়া দেড় লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। এই মিশ্রণটি ১৫ দিনে একবার করে প্রয়োগ করলে গাছের গোঁড়ার পিঁপড়া অনেকাংশেই দমন করা সম্ভব।

ভাত ও নিমপাতা

ছাদবাগানের গাছ খুব সহজেই মিলিবাগ দারা আক্রান্ত হতে পারে। এটি রোধে ভাত ও নিমপাতা ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫০ গ্রাম ভাত এক লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর মিশ্রণটি ভালোভাবে ঝেঁকে নিয়ে পাতার উপরে ও নীচে এবং আক্রান্ত স্থানে স্প্রে করতে হবে। মিলিবাগ নরম হয়ে গেলে কোন কিছু দিয়ে তা সরিয়ে ফেলতে হবে।

এক মুষ্টি নিমপাতার রস ২০০ গ্রাম পানিতে মিশিয়ে পাতার উপরে, নিচে ও আক্রান্ত স্থানে স্প্রে করেও মিলিবাগ দমন করা যায়। স্প্রে করার কিছুক্ষন পর  মিলিবাগ নরম হয়ে গেলে কোন কিছু দিয়ে তা আগের প্রক্রিয়াতেই সরিয়ে ফেলতে হবে।

দারচিনি

ছাদবাগানের গাছের ফাঙ্গাস বা ছত্রাক দমনে দারচিনি খুব কার্যকরী ভূমিকা রাখে। কয়েকটি দারচিনি গুঁড়ো করে নিতে হবে। এটি মাটির ওপর লেপে দিতে হবে। ১৫ দিনে একবার করে এটি প্রয়োগ করে ছত্রাকের আক্রমণ রোধ করা যায়।

চুন ও ছাই

এক চা চামচ চুন, এক লিটার পানিতে মিশিয়ে ২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। ১৫ দিন অন্তর এটি প্রয়োগ করলে ছত্রাকের আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

ছত্রাকের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ছাইও বেশ কার্যকর। ছোট টবের জন্য ১ চা চামচ ও মিডিয়াম টবের জন্য ২ চা চামচ ছাই প্রয়োগ করেও ছত্রাকের আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করা যায়।

আক্রান্তের প্রাথমিক অবস্থায় ছাদবাগানের গাছের রোগবালাই সনাক্ত করতে পারলে আরো অনেক সহজে এর সংক্রমন ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ করে আক্তান্ত পাতা, ডাল কিংবা ফুল ও ফল প্রথমেই হাত বাছাইয়ের মাধ্যমে ছাঁটাই করে তা বাগান থেকে দুরে সরিয়ে নিতে হবে। এসব ডাল, ফুল ও ফল পুড়িয়ে বা পুঁতে ফেলতে পারলে রোগের সংক্রমণ অনেকটাই কমে আসে। পাশাপাশি প্রতিদিন গাছে পানি দেওয়ার সময় পাতা ডালপালাগুলোকেও ধুয়ে ধুলামুক্ত রাখতে পারেন। এতে গাছপালা তুলনামূলক কম রোগাক্রান্ত হয়।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, গ্রিন সেভার্স

সারাবাংলা/এসএসএস


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button