আন্তর্জাতিক

সাজানো মামলায় কবির নির্বাসন দণ্ড, ৭০৬ বছর পরে আপিল

সারাবাংলা ডেস্ক

ঢাকা: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাজানো এক মামলায় ইতালির মহাকবি দান্তে আলিগিয়েরিকে দেওয়া নির্বাসন দণ্ডের বিরুদ্ধে ৭০৬ বছর পরে আপিল করা হয়েছে। ১৩১৫ সালে কবি নির্বাসন দণ্ড। বাবাকে সহযোগিতা করার অপরাধে দান্তের দুই ছেলেকেও দেওয়া হয়েছিল শিরশ্ছেদ দণ্ড।

বিজ্ঞাপন

এই রায়ের বিরুদ্ধে ৭০৬ বছর পর আপিল করা হয়েছে ইতালির আদালতে। এরইমধ্যে আপিল মামলা গ্রহণ করে ২১ মে শুনানির দিন ঠিক করেছেন আদালত।

১২৬৫ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্ম হয় দান্তের। ৩০ বছর বয়সে দান্তে ‘সাদা’ দলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি ছিলেন শহর পরিচালনা কমিটির নির্বাহী সদস্য।

বিজ্ঞাপন

১৩০১ সালে ফ্রান্সের সম্রাট ও ভ্যাটিকান পোপ অষ্টম বোনিফেসের সহায়তায় ক্ষমতায় ইতালিতে ক্ষমতায় বসে দান্তের বিরোধী দল ‘কালো’ দল। কালো দল ক্ষমতায় আসার পর ফ্লোরেন্স শহরে বাড়িঘরে আগুন লাগানোর মামলা ঠুকে দেওয়া হয় দান্তের নামে।

রায়ে তাকে নির্বাসন দণ্ড ও পাঁচ হাজার ফ্লোরিন মুদ্রা জরিমানা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু দান্তে এই বিচার বা রায় কোনোটাই মেনে নেননি। ফলে তিনি আপিল করার প্রয়োজনবোধ করেননি। ফলে দুই মাস পর তথা ১০ মার্চ পুনরায় রায় দেওয়া হয় যে, দুই বছর নয়, দান্তেকে আজীবন নির্বাসন দেওয়া হয়।

পাশাপাশি আদালত শর্ত জুড়ে দেয় যে, যদি আসামি ফ্লোরেন্স শহরে ঢুকতে চান তাহলে তাকে আটক করে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে। এ ছাড়া ১৪ বছর বয়স পূর্ণ হলে তার ছেলেদের নির্বাসনে পাঠানো হবে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাসন জীবনের ১২ বছর পর সরকার পক্ষ থেকে দান্তেকে প্রস্তাব পাঠানো হয় যে, যদি তিনি অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা ভিক্ষা করলে তাহলে তার জন্য শহরে ফেরার ব্যবস্থা করা যাবে।

কিন্তু এর জবাবে দান্তে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি লেখেন, প্রায় পনের বছর নির্বাসন সইবার পর দান্তে আলিগিয়েরিকে তার জন্মভূমিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হলো। এটি কি কোনো একটা উদার আহ্বান হলো? যে লোক সবসময়ে ন্যায়ের জন্য লড়াই করলো আর যার ওপর কেবলই অন্যায় করা হচ্ছে, এটাই কি তার প্রাপ্য? যারা অন্যায় করেছে তাদেরকেই ফের টাকা দিতে হবে? না, এভাবে আমি আমার নিজের দেশে ফিরতে চাই না। এ ছাড়া ফিরবার যদি কোনো পথ না থাকে তো আমি ফ্লোরেন্সে ফিরব না। তাতে কী! যেখানেই থাকি না কেন আমার চোখে কি সূর্য-তারার আলো থাকবে না? এই আকাশের নিচে যে কোনো মাটিতে আমি কি সত্যের ধ্যান করতে পারব না? তবে? তা হলে কিসের জন্য ফ্লোরেন্স আর ফ্লোরেন্সবাসীর কাছে মানসম্মান-খ্যাতি সব বিসর্জন দিয়ে আমার দেশে ফিরতে হবে? রুটির অভাব কোথাও ঘটবে বলে আমার মনে হয় না।’

বিজ্ঞাপন

সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় পূর্বের ঘোষণা অনুসারে তার সন্তানদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে। শুধু রায় নয়, বলা হলো দান্তে যেহেতু দেশে নেই সে জন্য কালবিলম্ব না করে ছেলে দুটির গর্দান নেওয়া হোক। কিন্তু তার সন্তানদের সৌভাগ্য বলতে হবে যে, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা পালিয়ে বাবার কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

চির নির্বাসন থেকে দান্তে আর কখনোই তার জন্মশহর ফ্লোরেন্সে ফিরে যেতে পারেননি। বিশ বছরের নির্বাসিত জীবন তাকে কাটাতে হয়েছিল বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে। ত্রেভিজো, লুচ্চা, পাদুয়া, ভেরোনো, রাভেন্না, তাসকানি, ভেনিস, মিলান প্রভৃতি জায়গায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ সময়ে জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ তাকে করতে হয়েছে। ছাত্র পড়িয়েছেন, বক্তৃতা দিয়ে জীবন নির্বাহ করেছেন।

১৩২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি রাভেন্না শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মারা যাওয়ার পর ফ্লোরেন্সের অধিবাসীরা ক্রমে ক্রমে বুঝতে পেরেছিল কাকে তারা অনাদরে ও অবহেলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

দান্তে এখনও শুয়ে আছেন রাভেন্নায়। দান্তে চলে গেলেও এখন স্বমহিমায় তার সাহিত্যভাণ্ডার। বিশেষত তার অমর কীর্তি ‘ডিভাইন কমেডি’।

সুখবর হলো- দান্তে ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবিচারের বিরুদ্ধে জনরোষে ক্ষমতা হারায় ফ্লোরেন্সের শাসক দল। এমনকি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় কালো দল। সেই জাগরণ থেকে ফ্লোরেন্সেই জন্ম হয় রেনেসাঁর। শত শত বছর পর সেই মামলার আপিল শুনানি হতে যাচ্ছে ফ্লোরেন্সের আদালতে।

আপিল মামলার শুনানিতে কবির বংশধর ও বিচারকদের বংশধরও উপস্থিত থাকবেন।

সারাবাংলা/একে


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button