স্বাস্থ্য

যেভাবে ১ থেকে ৮৭২০

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বিশ্বের ১০৪তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। সেদিন ইতালি ফেরত দুজন ও তাদের সংস্পর্শে আসা একজন বাংলাদেশি নাগরিকের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার কথা জানায় জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে প্রথম মৃত্যুবরণের তথ্য জানা যায় ১৮ মার্চের স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্রিফিংয়ে। এর পর থেকে ২০২১ সালের ১৮ মার্চ। কেটে গেছে একটি বছর। এই সময়ে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আট হাজার ৬২৪ জন। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী কারোনায় এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৮ হাজার ৭২০।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ ২০২১ সালের ২২ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য বুলেটিনে জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টায় ২৫ হাজার ১১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে দুই হাজার ৮০৯ জনের মাঝে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে মারা গেছে ৩০ জন। এ নিয়ে দেশে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২২ মার্চ পর্যন্ত এক বছরে আট হাজার ৭২০ জন মারা গেছে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে।

করোনায় প্রথম মৃত্যু

বিজ্ঞাপন

করেনা সংক্রমণ নিয়ে দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য জানানো হয় ১৮ মার্চের স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্রিফিংয়ে। ওই ব্রিফিংয়ে অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, যে ব্যক্তি মারা গেছেন তিনি সত্তরোর্ধ্ব। তার শ্বাসকষ্ট (সিওপিডি) ছাড়াও হৃদরোগ ও কিডনিজনিত সমস্যা ছিল। তিনি স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

করোনা সংক্রমণ নিয়ে মৃত্যু

বিজ্ঞাপন

দেশে একদিনে করোনা সংক্রমণ নিয়ে প্রথমবারের মতো ১০ জন মারা যায় ১৬ এপ্রিল। একদিনে মৃত্যুর সংখ্যা ২০-এর ঘর পেরিয়ে যায় ১৮ মে, সেদিন ২১ জন মারা যায়। ৩০ মে পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৮। তবে ৩১ মে করোনা সংক্রমণ নিয়ে মৃত্যু হয় ৪০ জনের। আর ১৬ জুন একদিনে মৃত্যু ৫০-এর ঘরও ছাড়িয়ে যায়। ৩০ জুন মৃত্যু পেরিয়ে যায় ৬০-এর ঘরও। সেদিন ৬৪ জন মারা গিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড এটিই।

কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০-এর ঘর স্পর্শ করে ১৫ এপ্রিল। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১০১ জন। এরপর মৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ অতিক্রম করে ২৫ মে। ১০ জুন করোনা সংক্রমণ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পেরিয়ে যায় হাজারের ঘর।

বিজ্ঞাপন

এরপর ৫ জুলাই ২ হাজার, ২৮ জুলাই ৩ হাজার, ২৫ আগস্ট ৪ হাজার, ২২ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার, ৪ নভেম্বর ৬ হাজার ও ১২ ডিসেম্বর করোনা সংক্রমণ নিয়ে ৭ হাজার মৃত্যু পেরিয়ে যায় দেশে। ২৩ জানুয়ারি দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা আট হাজার ছাড়িয়ে যায়।

২০২০ সালের ৯ মে দেশে ৮ জন মারা যায় কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে। এর পরে দৈনিক হিসেবে মৃতের সংখ্যা ছিল ১০ এর অধিক। এর ২৫৫ দিন পরে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি ৮ জন মারা যায় কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে। পরবর্তীতে অবশ্য এই সংখ্যা ৫ জনেও নেমে আসে একাধিকবার।

বিজ্ঞাপন

প্রথম চিকিৎসকের মৃত্যু

দেশে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পরে ৫ এপ্রিল সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. মঈন উদ্দিনের শরীরে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ৭ এপ্রিল তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে প্রথমে তাকে সিলেটে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৮ এপ্রিল সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৫ এপ্রিল সকাল পৌনে ৮টার দিকে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

প্রথম সাংবাদিকের মৃত্যু

২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল রাত পৌনে দশটায় মারা যায় দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার নগর সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক হুমায়ূন কবির খোকন। এদিন জ্বর ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, হৃদরোগের কারণে মারা গেছেন হুমায়ুন কবির খোকন। তবে মৃত্যুর আগে তার শরীর থেকে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছিল কি না তা জানার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য দেওয়া হয়। পরীক্ষার পর তার শরীরের করোনার সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

দেশে জাতীয়ভাবে ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে। সাম্প্রতিক দেশে বাড়ছে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মৃত্যুর হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হলেও এটা আসলে সব সময় এরকম নাও থাকতে পারে। ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হলেও স্বাস্থ্যবিধি না মানলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। করোনা হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি প্রাণঘাতী। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কার্যকরী সদস্য ডা. মোশতাক হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে মৃত্যুহার পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। কিন্তু এর কারণে কোনোভাবেই রিল্যাক্স থাকার উপায় নেই। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণের হারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। এজন্যও আমাদের রিল্যাক্স থাকার কোনো উপায় নেই। দেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম চলছে। সবাইকে ভ্যাকসিন নিতে হবে। সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমে আসবে। সেক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়েও সরকার পরিকল্পনা করতে পারে। তবে সবাইকে সামনের দিনগুলোতেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের এখনো একটা বিশাল অংশ কিন্তু সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্তকরণ পরীক্ষায় নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাদের পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে উৎসাহী করতে হবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসা সেবা বাড়াতে হবে। এছাড়া আইসোলেশন ও কোয়ারেনটাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে যদি সবকিছু পরিকল্পনা নিয়ে করা যায় তবে মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।’

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে— শনাক্তের হার শতকরা পাঁচ শতাংশের নিচে নেমে এলে সেটিকে স্থিতিশীল বা সহনীয় পর্যায় বলা যেতে পারে। আমাদের এখানে একটা দীর্ঘ সময় তেমনভাবেই গেছে। সংক্রমণ হার গত কিছুদিন যেভাবে বাড়ছে তা আশঙ্কাজনক। এক্ষেত্রে আসলে আমাদের রিল্যাক্স হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ বিশ্বের অনেক দেশেই কিন্তু এখন সংক্রমণ বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্র, কেরালাসহ আরও অনেক জায়গায় সংক্রমণ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি আমাদের মেনে চলতেই হবে। যেকোনো ধরনের শিথিলতার সুযোগে কিন্তু সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর হার পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের চেয়ে কম। কিন্তু এর কারণে রিল্যাক্স হয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমাদের স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে জোর দিতেই হবে।’

দেশে মৃত্যুহার কম হলেও সবসময়েই মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার দিকে গুরুত্ব দেন কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।

সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হলেও মাস্ক পরার প্রবণতা ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। অসুস্থ বোধ করলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াটাও জরুরি, যেন প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা শুরু করা যায়।’

সারাবাংলা/এসবি/পিটিএম


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button