ফিচার

২৫ মার্চ কালরাত্রীতে রুখে দাঁড়িয়েছিল অকুতোভয় পুলিশ সদস্যরা

রা’আদ রহমান

‘বেইজ ফর অল স্টেশনস, ভেরি ইমেপার্ট্যান্ট মেসেজ। প্লিজ কিপ নোট।…উই আর অলরেডি অ্যাটাক্টড বাই পাক আর্মি। ট্রাই টু সেভ ইয়োরসেলফ। ওভার অ্যান্ড আউট।’

বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের প্রারম্ভে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের খবরটি এভাবেই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ওয়্যারলেস থেকে প্রচার করেছিলেন ওয়্যারলেস বেইজ স্টেশনের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য শাহজাহান মিয়া। অসম সাহসে সে রাতে পাকিস্তানিদের অত্যাধুনিক সুসজ্জিত অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে শত শত পুলিশ সদস্যের রুখে দাঁড়ানোর বীরত্বগাঁথার একজন শাহজাহান মিয়ার এই মহামূল্যবান ওয়্যারলেস মেসেজটা পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করেছিল এবং রুখে দাঁড়ানোর জন্য যৎসামান্য প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। তেজগাঁও পেট্রল পাম্প থেকে রাত ১০টার দিকে একটি মেসেজ আসে, ‘পাকিস্তানি সেনাভর্তি ৩৭টি ট্রাক নগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে’। এই খবরটি পাওয়া মাত্র শাহজাহান সবাইকে জানিয়ে দেন এবং তারা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।

রাত সাড়ে এগারোটার দিকে যখন পাকিস্তানি সেনারা পুলিশ লাইন্স ঘিরে ফেলল, তখন ওয়্যারলেস অপারেটর শাহজাহান সারা বাংলাদেশে ওয়্যারলেসে পাকিস্তানিদের এই আক্রমণের খবর জানিয়ে আত্মরক্ষার জন্য তৈরি হওয়ার আহ্বান জানান। আর এদিকে রাজারবাগে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সামান্য থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়েই অসম কিন্তু দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বীর বাঙালি পুলিশের দল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কল্পনাও করেনি হতভম্ব হয়ে মৃত্যু বা প্রাণ বাঁচাতে পালানোর বদলে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও বাঙালি পুলিশরা স্রেফ থ্রি নট থ্রি সম্বল করেই এমন অকুতোভয় দুঃসাহসে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। স্বাভাবিকভাবেই এই সাহস পাকিস্তানি সেনাদের সহ্য হয়নি। ফলে তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো ভারী সাঁজোয়া যান ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানি ট্যাংকের গোলাবর্ষণ, মর্টারের শেলিং এবং অটোমেটিক মেশিনগানের অবিরাম গুলিবর্ষণের মুখে স্রেফ থ্রি নট থ্রি নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তোলা পুলিশরা বেশিক্ষণ টিকতে পারলেন না। ইস্ট পাকিস্তান প্রভিন্সিয়াল রিজার্ভ ফোর্সের (ইপিপিআরএফ) সাড়ে তিনশ এবং স্পেশাল আর্মড ফোর্সের (এসএএফ) পাঁচ থেকে ছয়শ পুলিশ ছিল সে রাতে রাজারবাগে। মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া প্রতিরোধযুদ্ধের এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা ইপিপিআরএফের চারটি টিনশেড ব্যারাক আগুনে পুড়িয়ে দেয়। মূল ভবনটিও গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায়। পাকিস্তানিরা বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়ায় জেনারেটর চালু করা যায়নি। প্রচণ্ড গোলাগুলিতে রাজারবাগে আগুনের ফুলকি উড়তে থাকে। মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া চারতলার ছাদে সহযোদ্ধাদের নিয়ে অবস্থান নেন এবং থ্রি নট থ্রি দিয়ে ফজরের আজান পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। ভোর পাঁচটার দিকে তাদের ঘিরে ফেলে বন্দী করে আর্মি। তখনও প্রায় ১০০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা টিকে ছিলেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা সারারাত উন্মত্ত উন্মাদনায় পুলিশ ব্যারাকগুলো ঝাঁজরা করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশ সদস্যদের পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। সেদিন কত পুলিশ সদস্য মারা গিয়েছিলেন জানতে চাইলে শাহজাহান বলেন, ‘ভোরের দিকে পাকিস্তানিরা আট-দশটি ট্রাকে করে লাশ বের করে নিয়ে যায়। আমার ধারণা, অন্তত দেড়শ পুলিশ শহিদ হয়েছিল। আর আমরা যারা রাজারবাগ থেকে পালাতে পারিনি, তাদের দেড়শ জনকে বন্দী করা হলো’।

২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট নামে যে সামরিক অভিযানে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয় রাজধানী ঢাকাজুড়ে, তার তিনটি লক্ষ্যস্থলের একটি ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স। তবে এখানে প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় পাকিস্তানি বাহিনীকে। ওই হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া আরও তিন মুক্তিযোদ্ধা আবু শামা, আবদুল মালেক খান ও আবদুল মতিন তরফদার আজও ভুলতে পারেননি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে দেখা সেই দুঃসহ বিভীষিকার স্মৃতি। বাঙালি পুলিশ এমন দুঃসাহসিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এটা পাকিস্তানিদের কোনো হিসেবেই ছিল না। ফলে পুলিশেরে আচমকা প্রতিরোধ যেমন তাদের হতভম্ব করেছিল, ঠিক তেমনি প্রচণ্ড অপমানিত ও ক্ষুব্ধ করেছিল। তারা মেনেই নিতে পারছিল না যে পুলিশ তাদের এভাবে ঠেকিয়ে দেবে। ফলে রাজারবাগে এরপর পুলিশ ব্যারাকগুলোতে আগুন ধরিয়ে এবং গোলাবর্ষণ-গুলিবর্ষণ ও বেয়নেট চার্জে নির্বিচারে পুলিশ সদস্যদের উপর যে গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা, সেটা ছিল পৈশাচিক এবং অকল্পনীয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ড এবং পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গ্রন্থেও এসব কথা উঠে এসেছে। শহিদ পুলিশের রক্তের ঋণ বইয়ে বলা হয়েছে, ‘সেদিন আটশ পাক সেনা পুলিশ লাইন্স আক্রমণ করে। রাজারবাগে পুলিশেরা প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করে থ্রি নট থ্রি দিয়ে। এ সময় পাকবাহিনী একটু থমকে গেলেও ট্যাংক, মর্টার ও হেভি মেশিনগান নিয়ে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের গুলি শেষ হয়ে গেলে জীবিত পুলিশ সদস্যরা যে যেভাবে পারে পালিয়ে যায়’।

অভিযান শেষে পরদিন ভোরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণকক্ষ যখন ওয়্যারলেস বার্তায় রাজারবাগে পুলিশের মৃতের সংখ্যা জানতে চাইছিল, তখন বলা হয়, এখনো গোনা শেষ হয়নি। তবে সংখ্যা অনেক। ঠিক কী পরিমাণ লাশ স্তূপে পড়ে থাকলে গোনা তখনো বাকি থাকে, সেটা বলাই বাহুল্য।

বিজ্ঞাপন

এরপরের গল্পটা আরও বেদনাদায়ক। সেই পুলিশ সদস্যদের লাশ ৮-১০টা ট্রাকে করে তুলে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি নিক্ষেপ করেছিল লোহারপুল খাল, বুড়িগঙ্গা নদীসহ বেশ কয়েকটি বহমান স্রোতের খাল আর নদীতে। যেন লাশগুলো ভেসে যায়, এদের কোনো চিহ্নও না থাকে। বাঙালি পুলিশের বীরত্ব পাকিস্তানি সেনাদের এতোটাই অপমানিত ও ক্ষুব্ধ করেছিল যে, তারা এই অকুতোভয় বীরদের মৃত লাশগুলোর কোনো চিহ্নও রাখতে চায়নি।

ওই সময় ঢাকা পৌরসভার সুইপার পরিদর্শক সাজেব আলী তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘২৬ মার্চ সকালে বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ির প্রবেশপথে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা দশটি লাশ পড়ে থাকতে দেখি। ফাঁড়ির চারদিকে দেয়াল গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয়ে আছে। আমি একটি ঠেলাগাড়িতে করে সব লাশ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে রেখে আসি। ২৮ মার্চ সকালে সব সরকারি কর্মচারীকে কাজে যোগদানের নির্দেশ দিলে আমি ঢাকা পৌরসভায় যাই। আমাদের ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে লাশ পরিষ্কার করতে বলা হয়। ২৯ মার্চ আমরা দুই ট্রাক লাশ তুলি। এগুলো ছিল পুলিশ, আনসারের। খাকি পোশাক পরা লাশ। আমরা অনেক মেয়ের ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলেছি’।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ঘোষণার পরেই রাজারবাগে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এই মহান বীর পুলিশ সদস্যদের স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা। তাদের পথ ধরে পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি দখলদার গণহত্যাকারী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহিদ হয়েছেন এগারোশর বেশি পুলিশ সদস্য। তাদের এই অপরিসীম আত্মত্যাগ আমাদের গর্ব ও অহংকারের পাথেয়। ২৫ মার্চ কালরাত্রীর সেই বেদনাদায়ক দুঃসহ সময়ের অর্ধশত বর্ষে এসে প্রবল বিক্রমে রুখে দাঁড়ানো সেই আত্মত্যাগী বীরদের স্মরণ করি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button