রাজধানী

জোর করে উঠছেন অতিরিক্ত যাত্রী, তবে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া

সাদ্দাম হোসাইন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আবারও দেশজুড়ে বাড়ছে করোনাভাইরাসের প্রকোপ। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। তার মধ্যে একটি হলো—সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে অর্ধেক যাত্রী পরিবহন। সরকারের ঘোষণার পর বুধবার (৩১ মার্চ) থেকে ৬০ শতাংশ বাড়তি ভাড়ায় চলতে শুরু করেছে গণপরিবহন।

বিজ্ঞাপন

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু পরিবহন অর্ধেক যাত্রী বহন করলেও অধিকাংশই মানছে না সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা। অনেক বাসে অতিরিক্তি যাত্রীর পাশাপাশি ভাড়াও নিচ্ছে ৬০ শতাংশ বেশি। এ নিয়ে যাত্রী এবং বাসের হেলপারদের (চালকের সহযোগী) মধ্যে বেঁধে যাচ্ছে ঝগড়া। তবে শেষ পর্যন্ত হার মেনে বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করেই গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা।

যাত্রীদের অভিযোগ, বাসমালিক-চালকদের সদিচ্ছা ছাড়া যাত্রীরা চাইলেও সামাজিক দূরুত্ব মেনে চলা সম্ভব না। এ ব্যাপারে প্রশাসনের নজরদারির অভাব আছে বলেও মনে করেন তারা।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর সাইন্সল্যাব এলাকা থেকে দেখা গেছে, আজিমপুর থেকে মিরপুরগামী পল্লবী পরিবহনে প্রতিটি আসনেই যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে, সেইসঙ্গে ৬০ শতাংশ ভাড়াও আদায় করছে পরিবহনটির হেলপার।

বাসে অর্ধেক যাত্রী তোলার কথা থাকলেও বাড়তি যাত্রী কেন নিয়েছেন, এমন প্রশ্নে বাসটির হেলপার রেগে গিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সেটা আমাকে বলেন কেন? যাত্রীগোরে জিগান। হেরা কেন উঠে? আমরা তো উঠাইবার চাই না।’

বিজ্ঞাপন

ভাড়া কি আগের মতোই নিচ্ছেন, নাকি বাড়তি নিচ্ছেন- এমন প্রশ্ন করলেও উত্তর না দিয়ে চালককে গাড়ি চালানোর ইশারা দিয়ে এড়িয়ে যান হেলপার। যে কারণে হেলপারের নামটি জানা যায়নি। বাস চলতে শুরু করলে এক যাত্রী চেঁচিয়ে বলতে থাকেন, ‘সরকার ভাড়া বাড়াবে আর তারা (হেলপার) নিবেন না, এত মানবিক তারা নয়রে ভাই…!’

পল্লবী পরিবহন ছাড়াও রাজধানীর সাইন্সল্যাব মোড় এলাকায় বিকাশ পরিবহন, ভিআইপি পরিবহন, ডি-লিংক পরিহবনেও অধিক যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

শাহবাগ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা ভুলতা পরিবহনেও একই দৃশ্য দেখা গেছে। তবে পরিবহনটির হেলপারের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের উদ্দেশ্যে তিনি চেঁচিয়ে বলতে থাকেন, ‘এ ভাইয়েরা দাঁড়িয়ে থাকারা নেমে যান। আপনেরা জোর করে উঠে পড়ছেন। এহন উনারা ছবি তুলে আমাদের মালিককে জানালে আমাদের ক্ষতি হবে। নামেন, নামেন…!’

জোর করে উঠছেন অতিরিক্ত যাত্রী, তবে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া

বিজ্ঞাপন

যদিও হেলপারের এমন আহ্বানে কোনো যাত্রীই সাড়া দেয়নি। উল্টো হেলপারকে বলতে শোনা গেছে, দাঁড়িয়ে না থেকে তাড়াতাড়ি বাস ছাড়েন।

এ সময় বাসটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা কেনো দাঁড়িয়ে যাচ্ছি, সে প্রশ্ন আমাদের না করে সরকারকে করুন। সরকার যে ভাড়া বাড়াইলো, অর্ধেক যাত্রী নেওয়ার ঘোষণা দিল। কিন্তু, আমাদের জন্য কি কোনো বাড়তি বাস নামাইছে? আমাদের অফিস কি বন্ধ করছে? করেনি। তাহলে আমরা অফিসে যাব কিভাবে? তাই নিরুপায় হয়ে ঝুঁকি নিয়েই উঠছি। কিন্তু, হেলপারও আগের ভাড়া নেয়নি। বাড়তি ভাড়া নিছে। তবুও আমাদের কিছু করার নেই। কারণ আমাদের সমস্যাটা কেউ দেখে না। সরকার বাড়তি ভাড়া নির্ধারণ করছে, যাত্রী অর্ধেক পরিবহনের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু, এ বাড়তি ভাড়ায় আমাদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ হয়েছে।’

নীলাচল পরিবহনের যাত্রী মুন্না সারাবাংলাকে বলেন, ‘যাব পাটুরিয়া কিন্তু গুলিস্তান প্রায় দেড় ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত হেলপারকে বলছি- প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে যাব, তবুও উঠতে দিন। পরে গাড়িতে উঠতে পারলাম। শাহবাগে এসে একজন যাত্রী নেমে যাওয়ায় বসতে পারছি।’

তবে ট্রান্সসিলভা পরিবহনগুলোকে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গেইট লক করে চলতে দেখা গেছে। পরিবহনটির একজন চালক রফিক উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের নির্দেশ রয়েছে বাসে অর্ধেক যাত্রী নিতে। আমরা তাই নিচ্ছি কিন্তু খুব খারাপ লাগে যখন দেখি রাস্তায় যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু আমাদের কিছু করার থাকে না। এজন্য হয়তো অনেকে বাধ্য হয়ে বেশি যাত্রী তোলে। আবার অনেক যাত্রী নিরুপায় হয়ে জোর করেই গাড়িতে উঠে পড়ে।’

তবে পরিবহনগুলোকে দেওয়া নির্দেশনার প্রতিপালন না হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের পরিবহনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা যদি নির্দেশনার ব্যত্যয় করে তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিন্তু পরিবহনগুলো কি করবে? যেখানে গাড়িতে উঠতে না পেরে যাত্রীরা গাড়ি ভাঙছে। আব্দুল্লাহপুরে ভেঙেছে, মাওয়াতে ভেঙেছে, আজিমপুরেও ভেঙেছে। পরে পুলিশ গিয়ে সমাধান করছে। তাহলে এত যাত্রী রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলে তারাও তো নিজেদেরকে কন্ট্রোল করতে পারে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (এসফোর্সমেন্ট) মো. সরওয়ার আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আজকে থেকে যেহেতু নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে। তাই আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে তদারকি করছেন বিষয়টি। বিকেলে তাদের সঙ্গে এটা নিয়ে মিটিং হবে। মাঠ পর্যায়ে তারা কি কি বিষয় ফাইন্ডআউট করবেন তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমরা আলাপ করবো।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার গণপরিবহনে যাত্রীদের জন্য একটা নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু, সেটি বাস্তবায়নের সময় কি কি প্রতিবন্ধকতা হতে পারে তা সম্ভবত বিবেচনা করেননি। কারণ গণপরিবহন সীমিত করে অফিস-আদালত চালু রাখলে, অফিসের কর্মীদের অফিসে যেতে তো সমস্যা হবেই।’

সারাবাংলা/এসএইচ/এমআই


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button