আইন-বিচার

শাপলা চত্বরে তাণ্ডব: ৮ বছর পর গতি এসেছে অর্ধশতাধিক মামলায়

আরিফুল ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ২০১৩ সালের ৫ মে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির আওতায় রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে কওমি মাদরাসাভিত্তিক ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। দিনভর আশপাশের গোটা এলাকায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ তাণ্ডব চালান সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে চলে দফায় দফায় সংঘর্ষ। শাপলা চত্বরসহ গোটা এলাকা যেন রণক্ষেত্র। শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্য দিয়ে মুক্ত হয় শাপলা চত্বর।

বিজ্ঞাপন

আজ থেকে ঠিক আট বছর আগের সেই দিনে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দায়ের করা হয়েছিল মোট ৮৩টি মামলা। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই দায়ের করা হয় অর্ধশতাধিক মামলা। আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, এসব মামলার মধ্যে সব মিলিয়ে ১৫টি মামলায় অভিযোগপত্র দায়ের করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করা যায়নি আট বছরেও।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সংগঠনটির ২০ থেকে ২৫ শীর্ষ নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের সেই ঘটনায় দায়ের করা বিভিন্ন মামলারও আসামি। ফলে তাদের সেই মামলাগুলোতেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আর তাকেই বেরিয়ে আসছে সেসব মামলার গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ বলছে, দীর্ঘ দিন ধরেই তারা মামলাগুলোর তদ্ন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজত নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলোর সূত্র ধরে তারা শিগগিরই মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করতে পারবেন। আদালতে অভিযোগপত্রও শিগগিরই দায়ের করা হবে।

জানা যায়, শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় সারাদেশে দায়ের করা মামলাগুলোতে আসামি করা হয় মোট ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে। আসামিদের তালিকায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। আসামিদের মধ্যে হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের নামও রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে পুলিশ ১৫টিতে অভিযোগপত্র দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও জানা গেছে, রাজধানীতে কেবল পল্টন থানাতেই দায়ের করা হয়েছিল ৩৩টি মামলা। এর বাইরে রমনা, মতিঝিল, ওয়ারী ও তেজগাঁওসহ বিভিন্ন থানা মিলিয়ে মোট মামলা হয়েছিল ৫৩টি। এর মধ্যে রমনা থানার একটি, শাহবাগ থানার একটি ও কলাবাগান থানার দুইটি মামলায় অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত এখনো চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন মামলাও। সেগুলোর তদন্তও একইসঙ্গে চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট আদালতে রাজধানীর পল্টন ও মতিঝিল থানা এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত মুন্সি জাহেদ জানান, পল্টন ও মতিঝিল থানায় হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে ৪৬টিরও বেশি মামলা রয়েছে। সবগুলো মামলাতেই তদন্ত চলছে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজাদ রহমান অবশ্য বলছেন, হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজধানীতে ৫৬টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে ছয়টির চার্জশিট দাখিল হলেও বাকি ৫০টির চার্জশিট এখনো দাখিল হয়নি। আজাদ রহমান সারাবাংলাকে বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে চার্জশিট দাখিল করলেই রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দ্রুত বিচার শেষ করার চেষ্টা করব। আশা করছি, তদন্ত কর্মকর্তারা দ্রুতই মামলার চার্জশিট দাখিল করবেন।

এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন মেসবা সারাবাংলাকে বলেন, আমার কাছে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানার ৩৫টির মতো মামলা আছে। এর মধ্যে চারটিতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। বাকিগুলোর অভিযোগপত্র এখনো দাখিল হয়নি। আমরা বলব, সবগুলো মামলায় যেন দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সে বিষয়ে উদ্যোগে নেওয়া উচিত। দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করলে আসামিদের হয়রানি কম হবে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, শাপলা চত্বরের তাণ্ডব পরবর্তী ঘটনার জের ধরে নারায়ণগঞ্জে ৯টি, চট্টগ্রামে তিনটি ও বাগেরহাটে পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাগেরহাটের একটি মামলায় সব আসামিকে খালাদ দেওয়া হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জের ৯ মামলার মাত্র দুইটিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি সব মামলায় এখনো তদন্ত চলছে।

এদিকে, এ বছরের শুরুতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে নতুন করে আলোচনায় আসে হেফাজতে ইসলাম। এর মধ্যেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে ঘিরে বিরোধিতা ও বিক্ষোভের পাশাপাশি সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করে হেফাজত। তাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। হেফাজতের এই সহিংসতা, ভাঙচুর ও নাশকতার ঘটনাতেও দেশব্যাপী প্রায় দেড়শ মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এসব মামলায় তিন হাজার ২৪৩ জন এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন। অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন আরও ৮০ হাজারের বেশি।

পুলিশ সূত্র বলছে, এসব মামলার তদন্তে নেমেই পুলিশ গত মাসখানেক সময়ে হেফাজতের ২০ থেকে ২৫ জন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করেছে। তাদের প্রায় সবাই-ই ২০১৩ সালে দায়ের করা মামলারও আসামি। ফলে তাদের সম্প্রতি দায়ের করা মামলায় যেমন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, একইসঙ্গে আদালতের অনুমতি নিয়ে ২০১৩ সালের মামলাতেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ফলে ২০১৩ সালের অনেক মামলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে।

সারাবাংলা/এআই/টিআর


Source link

আরো সংবাদ

Back to top button